দক্ষিণ ফাল্গুনকরার হাজারো মানুষ কাগজে-কলমে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেলেও বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ফাল্গুনকরা পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া এলাকায় গেলে মনে হবে এটি দেশের কোনো বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত চরাঞ্চল, কোনো প্রথম শ্রেণির পৌরসভার অংশ নয়। এলাকার মানুষের চলাচলের প্রধান ও জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় তা এখন সম্পূর্ণ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় কয়েক হাজার বাসিন্দা। বাধ্য হয়ে নিজেদের উদ্যোগে ও নিজেদের অর্থায়নে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে তাদের। সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ ফাল্গুনকরা পূর্বপাড়া-পশ্চিমপাড়া সংযোগ সড়কটি এই দুই পাড়ার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একমাত্র ভরসা। এই সড়ক দিয়েই প্রতিদিন শত শত স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক এবং জরুরি রোগীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াত। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি কাদা-পানিতে ডুবে যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে বড় বড় খানাখন্দের কারণে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের জরুরি কাজে যাতায়াত চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি সংস্কারের জন্য তারা বারবার পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে মৌখিক ও লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা ক্ষোভের সাথে বলেন, আমরা পৌরসভার নিয়মিত করদাতা, আমরা প্রতি বছর নিয়মিতভাবে পৌরকর, হোল্ডিং ট্যাক্স, ভূমি উন্নয়ন করসহ সব ধরনের কর পরিশোধ করে আসছি। কিন্তু কর পরিশোধ করেও নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যূনতম অধিকার, একটি ভালো সড়কও আমরা পাচ্ছি না। প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় বাস করেও আমাদের বাঁশের সাঁকোর উপর ভরসা করে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে বাতিসা ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এলাকাটি চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পৌরসভায় অন্তর্ভুক্তির দুই যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এই ওয়ার্ডের রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। পৌরসভার অন্যান্য ওয়ার্ডে দৃশ্যমান উন্নয়নমূলক কাজ হলেও ৬ নম্বর ওয়ার্ডটি সবসময় অবহেলিত থেকে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এই বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা দলের সভানেত্রী এবং ৪/৫/৬ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী মমতাজ বেগম। তিনি বলেন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডটি দীর্ঘদিন ধরে পৌর কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার। কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণে এই ওয়ার্ডের উন্নয়ন থমকে আছে। আমি এই বৈষম্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ভবিষ্যতে জনগণের সমর্থনে নির্বাচিত হলে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন সহ সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় আমি অগ্রণী ভূমিকা পালন করব। এলাকাবাসীর দাবি, বাঁশের সাঁকো কোনোভাবেই একটি স্থায়ী ও নিরাপদ সমাধান হতে পারে না। জরুরি মুহূর্তে রোগী পরিবহন, গর্ভবতী মায়েদের হাসপাতালে নেওয়া এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে পাকা করা অত্যন্ত জরুরি। তারা আশা করছেন, চৌদ্দগ্রাম পৌর কর্তৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের অবহেলিত সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করবে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য চৌদ্দগ্রাম পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এখন এলাকাবাসীর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার উন্নয়নের সুফল কি সব ওয়ার্ডের মানুষ সমানভাবে ভোগ করবে, নাকি দক্ষিণ ফাল্গুনকরার মানুষকে আরও অনির্দিষ্টকাল বাঁশের সাঁকোর উপর নির্ভর করেই তাদের জীবন কাটাতে হবে।






