স্বল্প খরচ, দ্রুতগতি এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারণে নীলফামারীতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের বিশেষ সেবা ‘স্পিড পোস্ট’।
বেসরকারী কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর অতিরিক্ত চার্জের বিপরীতে মাত্র কয়েক টাকায় নিরাপদ ডেলিভারি সুবিধা পাওয়ায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে এই সেবা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে নীলফামারী প্রধান ডাকঘরসহ জেলার সকল উপজেলা পর্যায়ের ডাকঘরগুলোতে সরকারের এই বিশেষ ‘স্পিড পোস্ট’ কার্যক্রম পুরোদমে চালু হয়। সাধারণ ডকুমেন্টস, সঞ্চয় ব্যাংক, জিইপি ও রেজিস্ট্রি সেবার পাশাপাশি নতুন চালু হওয়া এই কার্যক্রম গ্রাহকবান্ধব সেবায় রূপ নিয়েছে।
নীলফামারী প্রধান ডাকঘরের তথ্যমতে, গত জুলাই ‘২৬ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত স্পিড পোস্টের মাধ্যমে প্রায় ৫০০টি পার্সেল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নীলফামারীতে আসা সাড়ে ৩০০টিরও বেশি পার্সেল নিরাপদে গ্রাহকদের কাছে ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ডকুমেন্টস ও রেজিস্ট্রি চিঠির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯,০৯২টিতে, যা থেকে সরকারের রাজস্ব অর্জিত হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৯৭৪ টাকা।
ডাক বিভাগের সরবরাহকৃত তথ্যসূত্র অনুযায়ী, স্পিড পোস্টে ১ম কেজি পরিবহন খরচ মাত্র ১০ থেকে ১১ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কেজির জন্য নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা চার্জ। এছাড়াও এ সেবায় রয়েছে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছানো এবং আধুনিক ট্র্যাকিং সুবিধা।
পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের মিস্ত্রিপাড়ার কাঠের মিস্ত্রি রবান্নী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তার ছেলের জন্য রান্না করা গরুর মাংস পাঠাতে এসেছিলেন ডাকঘরে। তিনি জানান, “মাত্র ৯৭ টাকা খরচে রান্না করা খাবার নিরাপদে পৌঁছানো যাচ্ছে। এর আগেও একাধিকবার খাবার পাঠিয়েছি, প্রতিবারই সময়মতো ভালো অবস্থায় ছেলে তা হাতে পেয়েছে।”
একইভাবে সিলেট মৌলভীবাজারে নিজের ১৭৩ কেজি আসবাব ও বইপত্র পাঠাতে এসেছিলেন এমবিবিএস সম্পন্ন করা ডা. সুমাইয়া সুলতানা। তিনি বলেন, “বেসরকারি কুরিয়ারে এই ১৭৩ কেজি মালামাল পাঠাতে যেখানে প্রায় ৫ হাজার টাকা লাগত, সেখানে সরকারি স্পিড পোস্টে মাত্র দেড় হাজার টাকায় নিরাপদে পাঠাতে পারছি। বন্ধুদের পরামর্শে এসে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও নিরাপদ সেবা পেয়ে আমি ভীষণ সন্তুষ্ট।”
অনলাইন উদ্যোক্তা ও হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শিউলি আক্তার তার ‘শিউলি কানন’ পেজের প্রাকৃতিক মধু ও উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘সিদল’ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের কাছে পাঠাচ্ছেন এই স্পিড পোস্টের মাধ্যমে। তিনি জানান, বিগত তিন মাস ধরে স্পিড পোস্টে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই ও অত্যন্ত কম খরচে সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
শিক্ষার্থী আব্দুস সাত্তার জানান, “সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এতে কোন নিরাপত্তার অভাব নেই। সময়মতো পার্সেল পৌঁছানোর পাশাপাশি খরচও কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ে অনেক কম।”
প্রতিদিন বিকেলে ও রাতে বুকিং হওয়া মালামাল প্রথমে নীলফামারী থেকে তিতুমীর এক্সপ্রেস ও রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনে পার্বতীপুর পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রীয় ডাকযোগে সরাসরি রাজধানীতে পৌঁছে যায়। ব্যানার সূত্রে জানা গেছে, আজ বুকিং করলে আগামীকালের মধ্যে ঢাকা শহরের ২১টি পয়েন্টে এবং সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশে যেকোনো বৈধ পণ্য (যেমন: ফলমূল, চাল, ডাল, শাকসবজি ও আসবাবপত্র) পৌঁছে যাচ্ছে।
যানবাহনের সাময়িক ঘাটতি নিয়ে নীলফামারী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মো. শামসুজ্জোহা বলেন, “আমরা সপ্তাহে ছয় দিনই সেবা দিচ্ছি এবং শুক্রবারে পার্সেল এলেও তা ডেলিভারির ব্যবস্থা রাখা হয়। প্রধান সমস্যা হলো নিজস্ব গাড়ির অপ্রতুলতা। নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা হলে পার্বতীপুর নির্ভরতা কমবে এবং সরাসরি উপজেলাগুলোতে ডেলিভারি সহজ হবে। ইতোমধ্যে খুব শিগগিরই নীলফামারী পোস্ট অফিসের নিজস্ব গাড়ি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ডাক বিভাগের মতো বিশাল ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে আর কারো নেই। প্রায় চার হাজারের বেশি ডাকঘর ও হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিরলস পরিশ্রমে যেকোনো প্রান্তে ডোর-স্টেপ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এমনকি আইপিএস পোস্টিং ও ইউপিইউ-এর (Universal Postal Union) অধীনে পৃথিবীর যেকোনো দেশে সর্বনিম্ন খরচে চিঠি ও পার্সেল পাঠানো যাচ্ছে। নীলফামারী প্রধান ডাকঘর নাগরিকদের সর্বোত্তম সেবা প্রদানে সর্বদা বদ্ধপরিকর।”







