, ,

নিঃসঙ্গতার ওপারে-যেখানে শূন্যতার মাঝেই মন খুঁজে নেয় তার শেষ আশ্রয়!

নিউজটি শেয়ার করুন

যন্ত্রণার নিজস্ব একটা রূপ আছে। তা কখনো ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে, কখনো বক্ষপিঞ্জর ছিঁড়ে বের হতে চায় তীব্র রোদনে। এই যন্ত্রণারও কি কোনো শেষ সীমান্ত থাকে?

​যেখানে পৌঁছে গেলে মানুষের সমস্ত অনুভূতি তার ধারালো দ্যুতি হারিয়ে ফেলে, চোখ আর অশ্রু উৎপাদন করতে পারে না! হৃদয় কোনো নতুন আঘাতে দোলে না,সেটিই মানুষের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে গহীন ও রহস্যময় অঞ্চল। আমরা সচরাচর যাকে ‘হৃদয়হীনতা’ বা ‘মানসিক ক্লান্তি’ বলে ভুল করি, তা আসলে কোনো পতন নয়। বরং অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার হাত থেকে আত্মাকে বাঁচানোর শেষ প্রাকৃতিক দুর্গ। এটি কেবল বিষাদের কোনো আখ্যান নয়, বরং যন্ত্রণার চূড়ান্ত পথ হেঁটে নিজের প্রকৃত সত্তাকে খুঁজে পাওয়ার এক গভীর আত্মিক যাত্রা।

​মানুষের মনস্তত্ত্ব এক অদ্ভুত সীমান্তরক্ষী। আঘাতের পর আঘাত সয়ে বেদনার সুগভীর ভার বইতে বইতে একসময় সে এমন এক অচিন ভূখণ্ডে গিয়ে পৌঁছায়, যেখানে কোনো তীব্র যন্ত্রণা আর তাকে স্পর্শ করতে পারে না। মানুষের সহনশীলতার একটি অদৃশ্য সীমা থাকে। সেই সীমা পার হয়ে গেলে মন আর নতুন করে ভেঙে পড়ার শক্তি পায় না। ভেঙে পড়ার মতো অবশিষ্ট কিছুই তখন আর থাকে না। এটি ঝড়ের তাণ্ডব শেষে নদীর এক অবিশ্বাস্য, নিথর নিস্তব্ধতা,যেখানে ওপরে কোনো উত্তাল ঢেউ নেই, অথচ তলদেশের গভীরতা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। মন খারাপের এই চরম সীমায় মানুষ যখন আর আনন্দ কিংবা বেদনার তফাৎ করতে পারে না, বৈজ্ঞানিক ভাষায় তাকে বলা হয় ‘মনোবৈজ্ঞানিক অবশভাব’ (Psychological Numbness) বা ‘আবেগের নিঃশেষিত অবস্থা’।

​এটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়,বছরের পর বছর অতিমাত্রায় মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়ে মস্তিষ্কের নেওয়া এক চরম ‘আত্মরক্ষামূলক কৌশল’। অতিরিক্ত যন্ত্রণার সার্কিটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ‘সার্কিট ব্রেকার’ পড়ে যায়। মস্তিষ্ক তখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থেই অনুভূতির সমস্ত উৎসের সাথে সংযোগ কেটে দেয়, যাতে অতিরিক্ত মানসিক ক্ষরণে পুরো হৃদয় থমকে না যায়। সংবেদনশীলতা যখন এভাবে থমকে দাঁড়ায়, তখন সুখের প্রতি আর কোনো তীব্র লালসা থাকে না, দুঃখের প্রতিও থাকে না কোনো প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ। এটি পরম নিরপেক্ষতার এমন এক অবস্থা, যা প্রথম দর্শনে ভীতিপ্রদ মনে হলেও, এর গহীনে লুকিয়ে রয়েছে এক নিঃশব্দ প্রশান্তি।

​মানুষের আক্ষেপ, ক্ষোভ বা অভিযোগ তখনই থাকে, যখন অবচেতন মনে কিছু পাওয়ার বা বদলানোর অন্তত একবিন্দু আশা অবশিষ্ট থাকে। প্রত্যাশা ও পাওয়ার সমীকরণ যখন শূন্য হয়ে যায়, তখন অভিযোগের সুরগুলোও চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মধ্যকার সীমান্ত রেখাটি মুছে যায়। মানুষ তখন এক স্থির, অবিচল সত্তায় পরিণত হয়,যেখানে তাকে অতিরিক্ত আলো যেমন অন্ধ করতে পারে না, ঘোর অন্ধকারও আর ভয় দেখাতে পারে না। ​মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘আত্ম-বিচ্ছিন্ন অবস্থা’ (Depersonalization Detachment) ডিপারসোনালাইজেশন ডিটাচমেন্ট বলা যায়। একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের মন, শরীর বা চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করেন। মনে হয় তিনি যেন নিজ জীবনের একজন দর্শক মাত্র।
​ মন যখন তার সমস্ত আবেগ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়, তখন সে কেবল এক নীরব দর্শক হয়ে নিজেরই জীবননাট্য পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। নিজের ভেতরে এই আদিগন্ত নীরবতার মুখোমুখি হওয়া একই সাথে ভীতিপ্রদ এবং পরম মুক্তির। এই শূন্যতা বুঝিয়ে দেয়, মানুষের সত্যিকারের অস্তিত্ব তার চঞ্চল আবেগে নয়! সমস্ত আবেগের ঝড় শান্ত হওয়ার পর যে নিঃশব্দ ‘আমি’ টিকে থাকে, সেখানেই তার চিরন্তন সত্তা।

মন খারাপের এই চরম সীমানা পেরিয়ে যাওয়া কোনো জীবনের সমাপ্তি নির্দেশ করে না! বরং এটি একটি দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও তীব্র লড়াইয়ের পর মনের নিজেকে পুনর্গঠন করার এক নীরব বিশ্রামাগার। চরম শূন্যতার এই মহাসমুদ্র পার হয়ে মানুষ যখন ওপারে পৌঁছায়, সে আর আবেগের অন্ধ দাস থাকে না,পরিণত হয় নিজেরই অনুভূতির এক প্রজ্ঞাবান ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকে। পরম শূন্যতাই তখন তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, আর এই নিশ্চল নীরবতাই তার নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রথম স্পন্দন।

শাহিদা জাহান।