বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে যে ক’জন নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাদের শীর্ষে। তিনি শুধু দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটা যুগের বিবেক, একটা জাতির পথপ্রদর্শক। তার কলম ছিল তরবারির চেয়ে ধারালো, তার রসবোধ ছিল শাসকের আতঙ্ক।
১. কলমকে হাতিয়ার বানানো
মানিক মিয়া বুঝেছিলেন, সাংবাদিকতা মানে শুধু খবর ছাপা না। সাংবাদিকতা মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ১৯৫০ সালে তিনি যখন ইত্তেফাকের হাল ধরেন, তখন পূর্ব বাংলার মানুষের কথা বলার মতো কেউ ছিল না। তিনি ইত্তেফাককে বানালেন সেই কণ্ঠস্বর।
পাকিস্তান সরকারের সেন্সরশিপ, জেল-জুলুম, পত্রিকা বন্ধ – কোনো কিছুই তার কলম থামাতে পারেনি। “সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া সাংবাদিকের দায়িত্ব” – এই আদর্শে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তো ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে, ৫৪-এর নির্বাচনে, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে – প্রতিটি সংগ্রামে ইত্তেফাক ছিল মানুষের পাশে।
২. “রসিকতার ছলে সত্য বলা” – তার অনন্য কৌশল
সামরিক শাসনামলে সরাসরি সরকারের সমালোচনা করা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহের সমান। মানিক মিয়া বেছে নিলেন অন্য পথ। তিনি আবিষ্কার করলেন “বিদ্রূপাত্মক সাংবাদিকতা”।
আইয়ুব খানের মন্ত্রীদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে লিখলেন “টো টো কোম্পানির ম্যানেজার”। জেলার প্রশাসনের দুর্নীতি নিয়ে লিখলেন “জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ডায়েরি”। পাঠক হাসতে হাসতে বুঝে যেত – আসলে কাকে আঘাত করা হচ্ছে। শাসকরা রেগে যেত, কিন্তু ধরার কিছু পেত না। এই কৌশল তাকে বানিয়ে দিল “রাজনীতির জাদুকর”।
তার বিখ্যাত উক্তি: “আমি গালি দিই না। আমি শুধু আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিই।”
৩. সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও সাহস
মানিক মিয়ার সাংবাদিকতার ৩টি মূলমন্ত্র ছিল:
সততা: খবরের সত্যতা যাচাই না করে তিনি এক লাইনও ছাপতেন না। বলতেন, “মিথ্যা খবর একদিনের চমক, সত্য খবর শতাব্দীর সম্পদ।”
জনগণের পক্ষ: তিনি সবসময় লিখতেন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, সাধারণ মানুষের জন্য। ক্ষমতাবানদের তোষামোদ তার ধাতে ছিল না।
নির্ভীকতা: ১৯৫৮ সালে ইত্তেফাক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেল থেকে বের হয়েই আবার কলম ধরেন। বলেছিলেন, “পত্রিকা বন্ধ হতে পারে, কিন্তু মানুষের কথা বলা বন্ধ হবে না।”
৪. উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা
আজকের সাংবাদিকদের জন্য মানিক মিয়া একটা আদর্শ। তিনি শিখিয়েছেন –
১. সাংবাদিকতা মানে সরকারের মুখপাত্র হওয়া না, মানুষের মুখপাত্র হওয়া।
২. সাহস ছাড়া সত্য বলা যায় না, সত্য ছাড়া সাংবাদিকতা হয় না।
৩. কঠিন কথা বলতে হয় সহজ ভাষায়, যেন রিকশাওয়ালাও বোঝে।
১৯৬৯ সালের ১ জুন করাচিতে হঠাৎ মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুর আগের দিনও তিনি কলাম লিখে গেছেন। তার মৃত্যুতে সারাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। কারণ তারা বুঝেছিল – তাদের বিবেকটা আজ চলে গেল।
উপসংহার:
মানিক মিয়া প্রমাণ করে গেছেন, সাংবাদিকতা শুধু পেশা না, এটা ব্রত। কলম দিয়েও দেশ স্বাধীন করা যায়, মানুষ জাগানো যায়। আজ যখন মিডিয়া বাণিজ্যের চাপে, তখন মানিক মিয়ার আদর্শ আমাদের পথ দেখায় – “সত্য বলো, নির্ভয়ে বলো, মানুষের জন্য বলো।”
তিনি নেই, কিন্তু তার কলম আজও আমাদের জাগিয়ে রাখে।





