ব্যাখ্যা চেয়ে করা সাংবাদিকের চিঠির জবাব দিচ্ছে না এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম
গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্দিষ্ট কিছু তথ্য জানতে চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলেন দৈনিক প্রতিদিনের ভোরের চীফ রিপোর্টার মো মিরাজ ভূঁইয়া। সেই আবেদনের জবাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি তাকে এমন এক হিসাব ধরেছে যা শুধু চোখ কপালে তোলার মতো নয়, তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিয়ে গভীর প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। অধিদপ্তরের এক স্মারকে জানানো হয়েছে, আবেদনকারীর চাহিত তথ্য মজুদ আছে পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পৃষ্ঠা জুড়ে এবং সেই হিসাবে তিনি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে এগারো লক্ষ টাকা। পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে চালানের মূল কপি দাখিল সাপেক্ষে তবেই তথ্য দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। গত ২০ আগস্ট তিনি এই ফি নির্ধারণের যৌক্তিকতা ও আইনগত ভিত্তি জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো জবাব পাননি। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী প্রশাসন মো শফিকুল ইসলামের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, মিরাজ ভূঁইয়া গত ১৪ জুন তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর ৮ ধারার ১ নম্বর উপধারা অনুযায়ী গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন প্রকল্প দ্বিতীয় সংশোধিত সংক্রান্ত তথ্য চান। প্রকল্পটির কোড ২২৪২৫৯০০০, মেয়াদ নভেম্বর ২০১৮ থেকে জুন ২০২৭ এবং বাজেট ধরা হয়েছে তিন হাজার পাঁচশত পঞ্চাশ কোটি টাকা। আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৫ জুলাই তৎকালীন তথ্য কর্মকর্তা ও নির্বাহী প্রকৌশলী প্রশাসন মো আমিনুর রহমান প্রকল্প পরিচালককে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে চাহিত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেন। কিন্তু তারপরই গত ৪ আগস্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো শফিকুল ইসলাম স্মারক জারি করেন। ওই স্মারকে তথ্য অধিকার আইনের বিধি ৯(৬) উদ্ধৃত করে বলা হয়, আইনের এই বিধি অনুযায়ী প্রতি পৃষ্ঠা তথ্যের ফটোকপির মূল্য বাবদ দুই টাকা হারে মজুদকৃত পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পৃষ্ঠা তথ্যের মূল্য এগারো লক্ষ টাকা কোড নং ১-৩৩০১-০০০১-১৪২২৩০৮ এর চালানে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে গ্রহণ করতে হবে।
প্রশ্ন উঠেছে হিসাবের যুক্তিতে। প্রতি পৃষ্ঠা দুই টাকা হার মেনে নিলেও পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পৃষ্ঠার এই বিশাল সংখ্যাটিই কি সত্যিই আবেদনকারীর চাহিদার পরিধি, তা নিয়ে সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে করা আবেদন থেকে হঠাৎ সাড়ে পাঁচ লক্ষ পৃষ্ঠার মজুদ তৈরি হলো কীভাবে, তা ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী। তাঁর পাল্টা চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে, কোন ক্যাটাগরির তথ্যের জন্য মোট কত পৃষ্ঠা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই বিশ্লেষণমূলক তালিকার সত্যায়িত কপি দিতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক নথি যুক্ত করে পৃষ্ঠার সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে কি না, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদনও চাওয়া হয়েছে।
আইনি বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, ফি নির্ধারণ নিয়ে এলজিইডির এই অবস্থানের বিরুদ্ধে আইনে স্পষ্ট ভিত্তি রয়েছে। তথ্য অধিকার বিধিমালা ২০০৯ এর ৮ নম্বর বিধি ও সংশ্লিষ্ট ফরম অনুযায়ী এফোর ও এথ্রি সাইজ কাগজে ফটোকপির ফি নির্ধারিত প্রতি পৃষ্ঠা দুই টাকা, আর কোনো আইন বা বিধির অনুমোদন ছাড়া সরবরাহকৃত তথ্যের ক্ষেত্রে ফি লাগে না। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনের ৯ ধারার ৭ নম্বর উপধারা, যেখানে বলা হয়েছে তথ্য প্রদানের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তথ্যের মুদ্রিত মূল্য, ইলেকট্রনিক ফরম্যাটের মূল্য কিংবা ফটোকপি বা প্রিন্ট আউট সংক্রান্ত প্রকৃত ব্যয় অতিক্রম করা যাবে না। আইনের ৬ ধারার ২ নম্বর উপধারায়ও কর্তৃপক্ষকে কোনো তথ্য গোপন বা সহজলভ্যতা সংকুচিত করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চাহিত তথ্যের পরিধি অহেতুক বাড়িয়ে বা অপ্রয়োজনীয় নথি যুক্ত করে পৃষ্ঠার সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন তারা।
ডিজিটাল মাধ্যমের প্রশ্নও উঠেছে জোরালোভাবে। আইনের ৮ ধারার ৩ নম্বর উপধারায় ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা ইমেইলের মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ আবেদনকারী ইমেইল ও ডাকযোগ উভয় মাধ্যমেই তথ্য চেয়েছিলেন। প্রকল্পের দাপ্তরিক নথিপত্র ইতোমধ্যে ডিজিটাল বা ই ফাইলিং সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকায় সফট কপি সরবরাহ সম্ভব হলেও কাগজের ফটোকপির নামে সাড়ে পাঁচ লক্ষ পৃষ্ঠার বিল তৈরির কারণ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প পরিচালকের নিকট থেকে তথ্য সংগ্রহ না করে সরাসরি ফি নির্ধারণের প্রশাসনিক এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে চিঠিতে।
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা রয়েছে আবেদনকারীর সামনে। তথ্য অধিকার আইনের ২৫ ধারায় অযৌক্তিক ফি দাবির বিরুদ্ধে সরাসরি তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার বিধান আছে, আর কমিশন তদন্ত সাপেক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। ২৭ ধারায় তথ্য প্রাপ্তির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে বর্তমানে প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা হারে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। উল্লেখ্য, সরকার ইতোমধ্যে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রস্তাবিত খসড়ায় এই জরিমানা বাড়িয়ে প্রতিদিন দুইশত পঞ্চাশ টাকা হারে সর্বোচ্চ পচিশ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও অতিরিক্ত ব্যয় তথ্য চাওয়ার আগ্রহ নিরুৎসাহিত করার অবৈধ হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত, কারণ তথ্য প্রাপ্তির ব্যয় এত বেশি হওয়া উচিত নয় যাতে আবেদনকারীরা অনুরোধ করতেই ভয় পান।
চিঠিতে তথ্য অবমুক্তকরণ নির্দেশিকা নীতিমালা ২০১৫ পরবর্তী সংশোধিত ২০২০ এর ১৩ দশমিক ১ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এহেন তৎপরতাকে অসদাচরণ হিসেবে বিবেচনা করে বিভাগীয় ব্যবস্থার দাবিও তোলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিবরণী যেহেতু নিয়মিত হালনাগাদ হয়, হঠাৎ সাড়ে পাঁচ লক্ষ পৃষ্ঠার ফটোকপির পাহাড় তৈরির কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারী তাঁর চিঠির শেষে এগারো লক্ষ টাকার ফি নোটিশ বাতিল করে নির্ধারিত নিয়মে ও যুক্তিসংগত ব্যয়ে তথ্য দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু ২০ আগস্টের পর আজ পর্যন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি। ফি দাবির নোটিশও বহাল রয়েছে, সাংবাদিকের তথ্য পাওয়ার অপেক্ষাও।






