চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস ১৯৮০ সালের ৫ই মার্চ বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার খাজুরা গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সুখরঞ্জন বিশ্বাস ও মাতা পুষ্প রানী বিশ্বাস। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট।ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শিল্প ও সৃজনশীলতার অনুরাগী। বইয়ের পাতায় ছবি আঁকা ছিল তাঁর প্রিয় কাজ। একদিন তাঁর একজন কাকা, স্কুল শিক্ষক সুকুমার বেপারী,
রবি ঠাকুরের একটি প্রতিকৃতি দেখে জানতে চান কে এঁকেছে। মিলন বিশ্বাস জানান, “আমি।” তখন কাকা বলেন, “তুমি ভালো আঁকো, ভালোভাবে পড়াশোনা করো, এসএসসি পাস করে খুলনা আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে চিত্রশিল্পী হও।” এ কথাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা।
★মিলনের হৃদয়ের কথাঃ
সংসারের ছোট সন্তান হওয়ায় সবার আদরে বড় হয়েছিলেন। তার বড় দাদাবাবু নগেন্দ্রনাথ হালদার বলে “মিলনকে দিয়ে কিছু হবে না, গরুর ঘাস কাটা ছাড়া আর কিছু পারবে না” তাঁর মনে জন্ম নেয় দৃঢ় সংকল্প।অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি বুঝতে পারেন, জীবনে কিছু আলাদা করতে হবে। পরিবারের অনেক বাধা সত্ত্বেও শিল্পী হওয়ার স্বপ্নে ১৯৯৯ সালে খুলনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পিতা ও ভাইয়ের অনিচ্ছার মাঝেও মায়ের পায়ে হাত রেখে আশীর্বাদ নিয়ে তিনি গোপনে খুলনায় যাত্রাকালে তিনি মাকে বলেছিলেন মা কান্নাকাটি করো না। আমি এমন কোন কাজ করব না যা তোমাদের সেখানে গিয়ে সমাধান করতে হয়। তখন মা বলেছিলেন “তুমি কাউকে ঠকিয়ে বড় হয়ো না। কেউ উপকার করলে বিনিময়ে ভালোবাসা দিও, শ্রম দিও।”খুলনায় এসে প্রথমে “আঁকন” নামের এক কমার্শিয়াল আর্ট দোকানে দেড় বছর বিনা বেতনে কাজ করেন। এরপর ২০০১ সালে খুলনা আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে ২০০৬ সালে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
★পারিবারিক জীবনঃ
২০০৬ সালে তিনি মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার গোবিন্দপুর গ্রামের মন্টু বিশ্বাসের কন্যা শিলা বিশ্বাসকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। সে সময় তাঁর স্ত্রী খুলনা সরকারি মহিলা কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন।তাঁদের সংসারে দুই সন্তান এক ছেলে (২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে) এবং এক মেয়ে (বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত)। স্ত্রী তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস, তিনিই লেখালেখিতেও মিলন বিশ্বাসকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
★শিক্ষাজীবন ও প্রতিষ্ঠাঃ
ছাত্রজীবনেই ২০০৩ সালে তিনি খুলনার মিয়াপাড়ায় “নিশাত আর্ট কোচিং” প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে “খুলনা আর্ট একাডেমি” নামে পরিচিতি পায়। এখান থেকেই তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অধ্যয়নে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে যাচ্ছেন।২০১০ সাল থেকে তিনি চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর প্রশিক্ষিত দুই শতাধিক এর আধিক শিক্ষার্থী বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, এবং ১২ জন শিক্ষার্থী বিশ্বভারতী ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপে পড়ছেন।তাঁর শিক্ষার্থীরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারবার ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। তাঁর অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন পিটিআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট,ক্যাডেট কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং খুলনা আর্ট একাডেমি যে শহরে অবস্থিত সেই শহরের স্বনামধন্য বিদ্যালয় খুলনা জিলা স্কুল, খুলনা শিপইয়ার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সেন্ট জেভিয়ার্স ,নৌ বাহিনী শিশু পরিবার সহ আরো অন্যান্য বিদ্যালয়ে তার শিক্ষার্থীরা চাকরিরত আছেন।
★বেদনার অধ্যায়ঃ
তাঁর জীবনে একাধিক দুর্ঘটনা গভীর ছাপ ফেলেছে।
২০১৩ সালে খুলনা আর্ট একাডেমির শিক্ষার্থী রাবেয়া সুলতানা রাবু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।২ জুলাই ২০১৪ সালে শিক্ষার্থী অমিত রায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে মিলন বিশ্বাস ঘোষণা দেন “অমিতকে আমরা ভুলব না; তাঁর স্মরণে প্রতি রবিবার একাডেমি বন্ধ থাকবে।” এবং অমিতের মাকে মা ডাকেন বাবাকে বাবা ডাকেন। এবং ২০১৬ সালে শিশু শিক্ষার্থী শাফিন আল-তাজ এর মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। সেই থেকে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু তারপর অসুস্থতার মাঝেও তিনি থেমে থাকেননি শিল্প ও শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে গেছেন অবিরাম।তাঁর মা আজও জীবিত, যিনি প্রায়ই আশীর্বাদ করে বলেন“সৃষ্টিকর্তা তোমাকে শক্তি দিন।”
★ লেখালেখিঃ
লেখালেখির শুরু ১৯৯৫ সালে।তাঁর সৃষ্টিকর্মের পরিমাণ
কবিতা: ৭৭৮টি,গান: ৩৯৬টি,জীবনীমূলক গল্প: প্রায় ৩০টি।“অশ্রু ঝরা জল” খুলনার দৈনিক তথ্য পত্রিকায় সাংবাদিক নূর হাসান জনির মাধ্যমে প্রকাশের পর লেখালেখিকে জীবনের অংশ করে নেন তিনি।২০১৯ সালে তাঁর লেখা “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি” চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই থেকে তিনি নিয়মিত লিখছেন
দৈনিক জন্মভূমি, দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন, দৈনিক তথ্য, সাপ্তাহিক জনকথা, আজকালের আলো, জনবানী,ভয়েস অব টাইগার এবং বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়।
★যৌথ গ্রন্থে প্রকাশিত লেখাঃ
১. মরহুম লিয়াকত আলী স্মারক গ্রন্থে: “ঝরে গেল খুলনার উন্নয়নের চাবিকাঠি”
২. ‘নিদ্রিত নয়ন’ (সম্পাদনা: অলক রায় ও কাজল রায়) এতে তাঁর ১০টি কবিতা প্রকাশিত
৩. ‘খুলনার খণ্ড খণ্ড ইতিহাস ও রকমারি ভাবনা’ (লেখক: নাসির আহমেদ) এতে তাঁর ছবি ও লেখা স্থান পেয়েছে
৪. ‘কচুরিপানা’ (লেখক: হৃদয় সানা) বইটির প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছেন চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস।এর বাইরেও তিনি অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন।
★ সম্মাননা ও অর্জনঃ
আইন ও অধিকার বাস্তবায়ন ফোরাম: চারুকলায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন।
মেঠো বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থা: খুলনা বিভাগে নবীন চিত্রশিল্পী গড়ার কারিগর হিসেবে সম্মাননা স্মারক
বঙ্গকথা: নবীন চারু শিল্পীদের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিশেষ সম্মাননা
খুলনা মিউজিক ক্লাব (২০১৯): কবি হিসেবে সম্মাননা স্মারক
পরিমল সাহিত্য পত্রিকা (কলকাতা, ২০২১): কবি হিসেবে সম্মাননা
যমুনা টিভি (২০২৫): জীবনীভিত্তিক ডকুমেন্টারি প্রচার করেন।
C.U.C সংগঠন (বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৫): বিনা অর্থে শিক্ষাদানের জন্য সম্মাননা স্মারক
★ব্যক্তিগত দর্শন ও স্বপ্নঃ
চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের বিশ্বাস “এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে এমন কিছু করে যেতে হবে, যাতে মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা যায়।”তাঁর জীবনের সখ হলো অসহায় মানুষের বন্ধু হওয়া,
আর বর্তমান স্বপ্ন বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় চারুকলা শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া।
★সামাজিক সম্পৃক্ততাঃ
তিনি খুলনার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। শিক্ষার্থীদের আনন্দ দিতে মাঝে মাঝে জাদুবিদ্যার প্রদর্শনীও করেন।
২০২০ সাল থেকে তিনি ‘কলম যোদ্ধা’ গ্রুপের এডমিন, যেখানে নতুন লেখকদের লেখা প্রকাশে সহায়তা করেন।এছাড়া তিনি তার জন্মস্থান‘খাজুরা ঝালকাঠি’ নামে একটি সামাজিক পেজ পরিচালনা করেন, যেখানে গ্রামের খবর ও মানুষের জীবনী প্রকাশ করেন।বর্তমানে তিনি নিজ প্রতিষ্ঠিত খুলনা আর্ট একাডেমি পরিচালনা করছেন এবং প্রাক্তন ছাত্র মহানন্দ গাইনের পরিচালিত একটি অনলাইন স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে তিনি ক্লাস নেন না।




