, ,

অবকাঠামো উন্নয়নের কারিগর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার: চাই যথাযথ মর্যাদা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিশ্চয়তা

নিউজটি শেয়ার করুন

বাদল চৌধুরী : বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র | তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ | পৃথিবীর মধ্যে ছোট ভূখণ্ডে অন্যতম বহুল জনসংখ্যার এই বাংলাদেশ | একটি দেশের উন্নয়ন শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন কিংবা নকশা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, কারিগরি জ্ঞান, নিরলস পরিশ্রম ও মাঠপর্যায়ের কার্যকর তদারকি। বাংলাদেশের সড়ক, সেতু, কালভার্ট, ভবন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের এই বাস্তব কর্মযজ্ঞে যাঁরা প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

মাঠপর্যায়ের উন্নয়নে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য :
কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের সফলতা শুধু নকশা কিংবা অর্থ বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না। প্রকল্পের বাস্তবায়ন, নির্মাণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ, উপকরণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ, কাজের অগ্রগতি তদারকি এবং মাঠপর্যায়ে নানা কারিগরি সমস্যার সমাধান এসব ক্ষেত্রেই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রকল্পের ধরন ও দায়িত্ব বণ্টন অনুযায়ী তাঁদের অনেককে প্রতিকূল পরিবেশে সরাসরি কাজ করতে হয়। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নির্মাণস্থলে উপস্থিত থাকা, ঠিকাদারি কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নির্ধারিত কারিগরি শর্ত অনুসরণ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাঁদের ওপর বর্তায়।
অতএব, দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁদের অবদানকে কেবল একটি চাকরির পদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে দেখা যুক্তিসংগত নয়। তাঁদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও কাজের বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে যথাযথ মর্যাদা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, সুযোগের ক্ষেত্রেও চাই ন্যায্যতা :
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো উচ্চশিক্ষার সুযোগ। চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার পর একজন শিক্ষার্থী যদি আরও উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা গ্রহণ করতে চান, তবে তাঁর সামনে পর্যাপ্ত, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত পথ থাকা প্রয়োজন।
দেশের সব সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটদের জন্য যোগ্যতা ও আসনসংখ্যার ভিত্তিতে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ সম্প্রসারণ করা উচিত। তবে এ সুযোগ হতে হবে সুস্পষ্ট | প্রয়োজনে বিষয়ভিত্তিক ব্রিজ কোর্স, অতিরিক্ত গণিত ও মৌলিক বিজ্ঞানের প্রস্তুতি এবং ক্রেডিট সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এখানে মূল কথা হলো, ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ রাখা নয়; বরং তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে মূল্যায়ন করে পরবর্তী শিক্ষাস্তরে এগিয়ে যাওয়ার একটি কার্যকর পথ তৈরি করা। যাঁরা মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষা অর্জন করতে সক্ষম, তাঁদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণ দেশের সামগ্রিক কারিগরি জনশক্তিকেও সমৃদ্ধ করবে।

সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে পদ সংরক্ষণ হোক নীতিনির্ভর :
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের কর্মসংস্থান ও পেশাগত অবস্থান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের কারিগরি কাজে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতেও তাঁদের দক্ষতার প্রয়োজন হয়।
কিন্তু পদ সৃষ্টি, নিয়োগবিধি, পদোন্নতি এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যদি অস্পষ্টতা থাকে, তবে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উপযোগী পদগুলো চিহ্নিত করে সরকারি ও বেসরকারি খাতে সেগুলোর ধারাবাহিকতা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারি ক্ষেত্রে অনুমোদিত পদ, নিয়োগবিধি ও পদোন্নতির পথ স্পষ্ট করতে হবে। বেসরকারি ক্ষেত্রেও পেশাগত যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ, ন্যায্য বেতন, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এবং অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদবিন্যাস করতে হবে, যাতে কোনো শ্রেণির ন্যায্য সুযোগ ক্ষুণ্ন না হয়।

প্রকৌশল পেশায় সমন্বয়, বিভাজন নয় :
ডিপ্লোমা ও বিএসসি ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীদের মধ্যে মর্যাদা, দায়িত্ব কিংবা পদোন্নতি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে উন্নয়ন কার্যক্রমে। অথচ বাস্তবতা হলো, অবকাঠামো নির্মাণে পরিকল্পনা, নকশা, বিশ্লেষণ, বাস্তবায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিভিন্ন দায়িত্ব পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই একজনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যজনের অবদানকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষাগত যোগ্যতা, কারিগরি দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা, দায়িত্বের পরিধি এবং পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। বিএসসি প্রকৌশলীদের উচ্চতর একাডেমিক শিক্ষা এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের বাস্তবমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা উভয়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের উন্নয়ন আরও কার্যকর হবে।
পদবি বা পরিচয় নিয়ে বিতর্ক বাড়ানোর পরিবর্তে প্রয়োজন পেশাগত দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং যোগ্যতাভিত্তিক কর্মপরিবেশ। প্রকৌশল পেশার শক্তি বিভাজনে নয়, দক্ষতার সমন্বয়ে।

নীতিনির্ধারকদের কাছে সময়োপযোগী দাবি :
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ন্যায্য অধিকার ও সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, সরকারি প্রকৌশল বিভাগগুলোতে তাঁদের দায়িত্ব, পদোন্নতি ও পেশাগত অগ্রগতির পথ পর্যালোচনা করে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত নিয়োগবিধি প্রণয়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সব সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটদের স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ে সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে প্রযোজ্য ভর্তি-শর্ত ও বিষয়গত পূর্বপ্রস্তুতি স্পষ্ট থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রয়োজনীয় কারিগরি পদগুলোর জনবল চাহিদা নিরূপণ করে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে পদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে।
চতুর্থত, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ডিজিটাল নির্মাণব্যবস্থা, নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চমত, তাঁদের সংগঠন, পেশাজীবী প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি কার্যকর সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দাবি ও আপত্তিগুলো তথ্য, যুক্তি এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে সমাধান করা যায়।

অবহেলা নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে :
একজন দক্ষ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন; তিনি দেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর দক্ষতা বাড়লে নির্মাণকাজের মান উন্নত হতে পারে, ত্রুটি ও অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয় এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কার্যকারিতা বাড়ে। অন্যদিকে, তাঁর শিক্ষাগত অগ্রগতি ও পেশাগত উন্নয়নের পথ সংকুচিত থাকলে ব্যক্তিগত সম্ভাবনার পাশাপাশি জাতীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার সুযোগও সীমিত হতে পারে।
তবে অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রত্যেক প্রকৌশলীর সততা, জবাবদিহি, পেশাগত নৈতিকতা এবং জননিরাপত্তার প্রতি দায়বদ্ধতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিটি সড়ক, সেতু কিংবা ভবন জনগণের সম্পদ। সুতরাং কাজের মান, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হতে হবে তাঁদের পেশাগত দায়িত্বের প্রধান ভিত্তি।

উপসংহার :
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তাঁরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন বলেই তাঁদের দায়িত্বকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই; আবার উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও চাকরির অধিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে সমন্বয়।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ডিপ্লোমা পাস করা একজন মেধাবী শিক্ষার্থী তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী বিএসসি প্রকৌশল শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাবেন, একজন দক্ষ পেশাজীবী তাঁর কাজের ন্যায্য মূল্যায়ন পাবেন এবং সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে তাঁর পেশাগত অগ্রগতির পথ সুস্পষ্ট থাকবে।
উন্নয়নেরঅবদানকারীদের অবহেলা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, পদোন্নতি ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার দাবিকে বিচ্ছিন্ন কোনো গোষ্ঠীর দাবি হিসেবে নয়, বরং দেশের কারিগরি শিক্ষা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হবে ন্যায্য দাবি শুনে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নই হবে পেশাগত অগ্রগতির ভিত্তি। আমরা সবাই মিলে একসাথে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই, এই হউক আমাদের সকলের অংগীকার |

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড