, ,

নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়

নিউজটি শেয়ার করুন

রাজু আলীম : বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এমন এক দিন, যেদিন রাজপথে জন্ম নেয় এক নতুন রাজনৈতিক চেতনা, যার প্রতিধ্বনি আজও জাতির রাজনৈতিক জীবনে অনুরণিত হয়। স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর জাতি যখন বিভাজিত, দিশাহীন এবং বিদেশি প্রভাবের ঘূর্ণিতে বিপর্যস্ত, তখন সেনা-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্য একদিনে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। একদিকে সামরিক শৃঙ্খলার ভেতর বিক্ষুব্ধ সিপাহিদের বিদ্রোহ, অন্যদিকে রাজপথে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাস—এই দুই প্রবাহ মিলিত হয়ে জন্ম দেয় নতুন জাতীয়তাবাদের সূচনা, যার নেতৃত্বে আবির্ভূত হন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে এক ধরনের প্রতিবিপ্লব সংঘটিত হয়, যা ছিল মূলত আওয়ামী লীগ ও ভারতের সমর্থিত ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। কিন্তু মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেই চেষ্টার পরিণতি ঘটে ভয়াবহভাবে। ৬ নভেম্বর রাতে সেনানিবাসে সৈনিকদের বিদ্রোহ শুরু হয় এবং রাজধানীর রাস্তায় লাখো মানুষ সৈনিকদের সমর্থনে নেমে আসে। পরদিন সকালেই “সিপাহি-জনতা ভাই ভাই”, “জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ” এবং “ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিপাত যাক” স্লোগানে কেঁপে ওঠে ঢাকার আকাশ। সেই মুহূর্তে কেবল একটি সরকারের পতন হয়নি, জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন জাতীয় চেতনা—‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’।
জিয়াউর রহমান সেই চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসে স্বজনপ্রীতি ও মতাদর্শিক সংকীর্ণতার বিপরীতে জনগণের আত্মপরিচয়ের দাবি। তিনি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ ও ‘আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও ঈমান’ সংযোজন করে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেন। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাবকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মমর্যাদাশীল এক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে—যে রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবের বিপরীতে জিয়ার অবস্থানই তাঁর হত্যার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮১ সালে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বঙ্গোপসাগরের তালপট্টি দ্বীপ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বিরোধ জিয়ার হত্যার আগেই চরমে পৌঁছেছিল। সেই সময় বাংলাদেশের জনগণ যখন স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিয়ে দৃঢ় অবস্থানে ছিল, তখনই জিয়ার আকস্মিক হত্যাকাণ্ড দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্যে গভীর ধাক্কা দেয়।

তবে শহীদ জিয়ার মৃত্যু তাঁর দর্শনের অবসান ঘটায়নি। বরং তাঁর হাতে গড়া দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) হয়ে ওঠে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি, যার মূল ভিত্তি ছিল ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের জাতীয়তাবাদী চেতনা। স্বাধীনতার পর যেখানে রাজনীতি ছিল একদলীয় প্রভাবাধীন, সেখানে জিয়া ফিরিয়ে আনেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাই তাঁর শাসনামলে রাজনীতিতে, প্রশাসনে এবং অর্থনীতিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পুনর্গঠন শুরু হয়।

২০২৪ সালের আন্দোলন ও পরবর্তী ‘জুলাই বিপ্লব’ এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে আনে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ ও জুলাই ২০২৪—এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাই আদর্শগতভাবে একই ধারার প্রতিফলন, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই জনগণ ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ৭ নভেম্বর কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাংলাদেশের জাতিসত্তার পুনর্জাগরণের প্রতীক। সেই দিনে সৈনিক-জনতা এক হয়ে বলেছিল, বাংলাদেশ কোনো উপনিবেশ নয়, কোনো বিদেশি শক্তির তত্ত্বাবধানে নয়—নিজস্ব আত্মপরিচয়ে বিশ্বাসী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই চেতনা আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে যখন দেশের রাজনীতি আবারও নতুন বিন্যাসে প্রবেশ করেছে এবং তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে কল্পনা করতে চাইছে।

আজকের প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হচ্ছে—জনগণের আত্মবিশ্বাস ও ঐক্যের শক্তি যে কোনো দমননীতি ও বিদেশি প্রভাবকে পরাস্ত করতে পারে। ১৯৭৫ সালে যেমন সৈনিকরা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি জনগণ রাজপথে নেমেছিল নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সেই ঐক্যের চেতনা থেকেই জন্ম নেয় ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ধারণা, যা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, বরং আত্মপরিচয়ের নবজাগরণের প্রতীক।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়তো ৭ নভেম্বরকে কেবল একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে দেখে, কিন্তু বাস্তবে এটি আমাদের রাষ্ট্রচেতনার মৌলিক ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছিল, আর ৭ নভেম্বর দিয়েছিল স্বাধীনতার অর্থ—নিজস্বতা ও মর্যাদা। যদি জুলাই বিপ্লবকে ‘নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ বলা যায়, তবে তার বীজ নিহিত ছিল সেই ৭ নভেম্বরের জনগণ-সেনা সংহতিতে।

আজ সময় এসেছে আবার সেই চেতনায় ফিরে যাওয়ার। দলমত নির্বিশেষে আমাদের স্বীকার করতে হবে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কোনো আপস হতে পারে না। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী ও সৎ নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুপস্থিত। তিনি যেভাবে জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বনির্ভর অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন, সেভাবে আজও আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে পুনর্গঠন করতে হবে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আমাদের জাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরমূলক দিন। এই দিনটি অনেকেই শুধু সেনা অভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক পালাবদলের মুহূর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল বজ্রশ্লোগানে উঠে আসা জাতীয়তাবাদের পুনরুজ্জীবনের দিন—যেখানে সাধারণ মানুষ, সৈনিক এবং দেশের সার্বভৌমত্ব-চিন্তা একসঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিল।

গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেছি, ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা হয় শুধু কে কী করেছিল, কারা নিহত হয়েছিল, বা কোন ইউনিট বিদ্রোহ করেছিল ইত্যাদি বিষয়ে। কিন্তু যদি আমরা একটু গভীরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব যে ওই দিনটি ছিল এক নতুন জাতীয় চেতনার রূপায়ণ। স্বাধীনতার পর প্রশ্ন উঠেছিল—স্বাধীনতা কি শুধু ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার নাম, নাকি স্বাধীন চিন্তা ও আত্মনির্ভরতার? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল ৭ নভেম্বর।

সেদিন ঢাকার রাস্তায় সবাই একসঙ্গে বলে উঠেছিল, “উপনিবেশের রাজনীতি আর নয়, নিজের ভাবনায় নিজেদের মুক্তির রাজনীতি হবে।” “ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিপাত যাক” বা “নিজের দেশ নিজেরভাবে চালাবো”—এই স্লোগানগুলো তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পাল্টে দিয়েছিল। মানুষ বুঝেছিল, স্বাধীনতার মানে কেবল মুক্তিযুদ্ধের বিজয় নয়, বরং সেই স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখা, আত্মমর্যাদা রক্ষা করা এবং জাতিসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করা।

এই রাজনৈতিক ক্রমবদল কেবল ক্ষমতার লড়াই ছিল না; এটি ছিল দেশের আত্মপরিচয় গড়ার নতুন অধ্যায়। যে দিন সৈনিক-জনতা একত্রে উচ্চারণ করেছিল “জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ”, “সিপাহী-জনতা ভাই ভাই”, “ভারতীয় দালাল মোশাররফ মুর্দাবাদ”—সেদিন তারা এক ধরনের জাতীয় আত্মপ্রতিজ্ঞা করেছিল।

আজও আমরা দেখতে পাই, যখন জনগণের অংশগ্রহণ রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যায়, তখন আদর্শের রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মূল শিক্ষা হলো—জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, এবং তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক আদর্শ টিকে থাকতে পারে না।

৭ নভেম্বর আজ শুধু স্মৃতির দিন নয়; এটি এক নতুন সূচনা, এক নবজাগরণের আহ্বান। যদি আমরা সেই চেতনায় ফিরে যেতে পারি, তাহলে নতুন বাংলাদেশ হবে কেবল উন্নয়ন ও নির্বাচনের প্রতিযোগিতার দেশ নয়, বরং হবে এক আত্মবিশ্বাসী, সার্বভৌম, সংস্কৃতিমূলকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র—যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র হবে জাতির মূল ভিত্তি।

৭ নভেম্বরের ঐক্য, সেই আত্মবিশ্বাস, সেই জনসেবামূলক রাজনীতিই যদি আমরা আবার উপজীব্য করি—তাহলে সত্যিই “নতুন বাংলাদেশের” অভ্যুদয় হবে।

রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব