জনসেবার সুমহান ব্রত নিয়ে যে চিকিৎসা পেশার যাত্রা, ফেনীর ছাগলনাইয়ায় তা আজ প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতির করাল গ্রাস এবং চরম নৈতিক স্খলনের যাঁতাকলে পিষ্ট।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আবু তাহের স্বপনের একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপকর্ম, অনিয়ম, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও চরম নৈতিক অবক্ষয়ে ভেস্তে যেতে বসেছে পুরো ফেনীর স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘদিনের সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার ও ধরাকে সরা জ্ঞান করার পরও কোনো এক অদৃশ্য খুঁটির জোরে তিনি অধরা থেকে যাওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল ও অসহায় চিকিৎসকদের ক্ষোভ আজ আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসে উঠছে।
রাজনীতির বহুরূপী খোলস ও ক্ষমতার দাপট
অনুসন্ধানে প্রকাশ, আদর্শিক অবস্থান বিকিয়ে সুবিধাবাদিতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন এই কর্মকর্তা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত এই চিকিৎসক সুবিধাজনক সময়ে খোলস বদলে আওয়ামী সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)’-এ নাম লিখিয়ে বাগিয়ে নেন আজীবন সদস্যপদ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে আবারও রূপ বদলে বর্তমানে তিনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
দলীয় পরিচয়ের আড়ালে নিজের অপরাধ ঢাকাই তার মূল কৌশল। অনুসন্ধানে জানা যায়, জামায়াতের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ এক নেতার সঙ্গে তার গোপন সমঝোতা ও সখ্যতা রয়েছে। বিগত সময়ে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সাচিপ) হিসেবে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ও গণহত্যার দায় সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ ও মামলা চলমান রয়েছে। ২০১৮ সালে ফেনী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ইনচার্জ থাকাকালে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর সাথে তার অনৈতিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যা আজও বিদ্যমান।
পুকুরের মাছ ও গাছ বিক্রি: সরকারি তহবিল তছরুপের উৎসব
ডা. স্বপনের বিরুদ্ধে সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত মালামালের মতো লুটপাট করা নিয়ে। ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুকুর থেকে প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকার মাছ বিক্রি করে সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে সোজাসুজি নিজের পকেটে পুরেছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণের প্রায় ৫০টি মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করলেও তার এক টাকাও রাজস্ব খাতে জমা পড়েনি। প্রশাসনিক নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি সম্পত্তি বিক্রির এই টাকা পকেটস্থ করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হলেও অলৌকিক কারণে নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।
ওষুধ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও সহকর্মীদের জিম্মি
অভিযোগের পাহাড় এখানেই শেষ নয়; পদাধিকার বলে তিনি সহকর্মী চিকিৎসকদের ওপর অন্যায় নির্দেশ চাপিয়ে দিতেন—একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ লিখতে বাধ্য করা হতো তাদের। হাসপাতাল সংস্কার, কেনাকাটা ও সরকারি টেন্ডারের অর্থ লুটপাটে ‘পার্সেন্টেজ’ বা পিসি বাণিজ্যকে তিনি পরিণত করেন নিয়মে। চিকিৎসার নামে চরম অবহেলা ও অনিয়মের প্রতিবাদে নার্স ও কর্মচারীরা একাধিকবার সিভিল সার্জন ও তত্ত্বাবধায়ক বরাবর লিখিত আকুতি জানালেও অজ্ঞাত প্রভাবে তা বারবার ধামাচাপা পড়েছে।
অন্যদিকে, হাসপাতালের একটি কোটি টাকা মূল্যের জেনারেটরসহ বিপুল পরিমাণ সরকারি সরঞ্জাম অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। অথচ এই কর্মকর্তা নিজের কার্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে নিজস্ব খেয়ালখুশিতে মত্ত থাকেন। সিভিল সার্জনের পরিদর্শনের নির্দিষ্ট দিন ছাড়া সাধারণ কর্মদিবসে তাকে কর্মস্থলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
নারী লাঞ্ছনা ও নৈতিকতার চরম ধস
চিকিৎসক রূপী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠে এক নার্সকে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও সম্মানহানির মতো ন্যক্কারজনক অভিযোগ। ঘটনা জানাজানি হলে তোপের মুখে পড়ে নিজের পিঠ বাঁচাতে একপর্যায়ে তিনি ভুক্তভোগী নার্সকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সম্প্রতি চলন্ত গাড়িতে পারিবারিক কলহ ও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ঘৃণা ও ধিক্কারের সৃষ্টি হয়।
রাষ্ট্রাচার লঙ্ঘন ও ধরাকে সরা জ্ঞান
নিজের অপকর্মের রাজত্ব বজায় রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙানো তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতনদের সাথে সখ্যতার দাপট দেখিয়ে তিনি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলতেন—তাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো নেই। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক শীর্ষ ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংবেদনশীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করতেও তার হাত কাঁপেনি।
প্রশাসনের নিরবতা ও জনমনে তীব্র ক্ষোভ
অতীতে অনিয়মের অভিযোগে নোয়াখালী ও কমলনগরে বদলি করা হলেও, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি পুনরায় ফেনীতে ফিরে আসেন। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরাবর এসব দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা থমকে আছে।
স্বৈরাচারী মানসিকতার এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ক্ষমতার আসল উৎস কোথায়—তা নিয়ে এখন সর্বমহলে প্রশ্ন উঠেছে। ফেনী ও ছাগলনাইয়ার সর্বস্তরের জনগণের একটাই দাবি—চিকিৎসা সেবাকে বাণিজ্যে পরিণত করা, সরকারি তহবিল আত্মসাৎ এবং নৈতিকতার চরম অধঃপতনে পৌঁছানো এই ডা. স্বপনের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিচারবিভাগীয় ও বিভাগীয় কঠোর তদন্ত সাপেক্ষে তাকে বরখাস্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রুত ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।







