আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, জুয়ার ঋণ পরিশোধে চাঁদা দাবির তথ্য পেয়েছে পিবিআই,
গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায়
হাজী আব্দুর রহিম পাইকারি কাপড়ের মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে,
এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় মোঃ জুয়েল আহমেদ (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), গাজীপুর জেলা। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৫টা ১৯ মিনিটে গাজীপুর মহানগরের বাসন থানাধীন চান্দনা চৌরাস্তার হাজী আব্দুর রহিম পাইকারি মার্কেটে অবস্থান করছিলেন মার্কেট পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মিলটন হোসেন। এ সময় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়াসহ সুযোগ পেলে তাকে হত্যা ও জখম করার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে মার্কেট পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মিলটন হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) বাসন থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর-১০, তারিখ ৬ অক্টোবর ২০২৬; দণ্ডবিধির ৩৮৫/৫০৬/৩৪ ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।
পুরোনো অগ্নিকাণ্ডের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি
পিবিআই জানায়, ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর হাজী আব্দুর রহিম পাইকারি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মার্কেটটির প্রায় সম্পূর্ণ অংশ পুড়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ মালামাল, নগদ অর্থ ও আসবাবপত্রের ক্ষয়ক্ষতি হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদা দাবিকারী ব্যক্তি ফোনে ওই অগ্নিকাণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আবারও এমন ঘটনা ঘটলে আগের চেয়েও বেশি ক্ষতি হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পিবিআই গাজীপুর জেলার একটি ক্রাইমসিন টিম শুরু থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ১২ অক্টোবর স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করা হয়।
বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার জুয়েল
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোঃ মোস্তফা কামাল, বিপিএম-সেবা-এর সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার, পিপিএম-সেবা-এর তত্ত্বাবধানে বিশেষ তদন্ত দল অভিযান পরিচালনা করে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) মোঃ সোহেল রানার নেতৃত্বে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে গাজীপুর মহানগরের বাসন থানাধীন দিঘীরচালা এলাকা থেকে জুয়েল আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার জুয়েল আহমেদ জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ থানার কাঠারবিল গ্রামের সাদা মিয়া ও জমিলা বেগমের ছেলে। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
জুয়ার ঋণ পরিশোধ করতেই চাঁদা দাবির পরিকল্পনা
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, জুয়েল আহমেদ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করছিলেন। এর মধ্যে তিনি ক্যাসিনো ও জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন। জুয়ার কারণে কর্মস্থল ও এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি।
ঋণের টাকা পরিশোধের উদ্দেশ্যে হাজী আব্দুর রহিম পাইকারি মার্কেটের সামনের সাইনবোর্ড থেকে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন জুয়েল। পরে ওই নম্বরে ফোন করে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে মার্কেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন।
পিবিআই জানায়, হুমকির মুখে বাদী প্রথমে বিকাশের মাধ্যমে তিন হাজার টাকা পাঠান। পরবর্তী সময়ে আবারও টাকা দাবি করলে আরও দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়। সর্বশেষ সোমবার ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যেই পিবিআইয়ের অভিযানে গ্রেফতার হন অভিযুক্ত জুয়েল।
সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধ করা গেছে: পুলিশ সুপার
এ বিষয়ে পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার, পিপিএম-সেবা বলেন, আসন্ন শীতের শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিটি মার্কেট ও জনসমাগমস্থলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এ ধরনের চাঁদাবাজি প্রতিরোধে মার্কেটের সামনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিরাপত্তাপ্রহরী নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন গ্যাম্বলিং, ক্যাসিনো ও প্রচলিত জুয়ার আসক্তি থেকে মানুষকে বের করে আনতে সমন্বিত সামাজিক গবেষণা এবং রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ ও তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
পুলিশ সুপার বলেন, সফল অভিযানের মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন চাঁদাবাজির মতো অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে একটি সম্ভাব্য নাশকতাও রুখে দেওয়া গেছে।
এ ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তির সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মামলাটি বর্তমানে পিবিআই গাজীপুর জেলার এসআই (নিঃ) মোঃ সোহেল রানা তদন্ত করছেন।






