, ,

এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার ৭৩তম জন্মদিন আজ

নিউজটি শেয়ার করুন

মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্ররাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে দীর্ঘ পথচলা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্ররাজনীতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্ব ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার ৭৩তম জন্মদিন আজ ১০ অক্টোবর। ১৯৫৩ সালের এই দিনে পাবনার সুজানগর থানার মুরারিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্র আন্দোলন, কারাবরণ, দলীয় নেতৃত্ব এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শিক রাজনীতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। জন্মদিনে তাঁর জীবন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।

খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার পিতা প্রয়াত খোন্দকার মুর্শিদুল হোসেন এবং মাতা প্রয়াত সালেহা মুর্শিদ। পারিবারিকভাবে সমাজসেবা, শিক্ষার প্রসার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁদের অনুরাগ ছিল।
পাবনার সুজানগরের গ্রামীণ পরিবেশে তাঁর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁর চিন্তা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রতিফলন ঘটেছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, শোষণ-বৈষম্য এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থেকে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেশের অসংখ্য তরুণের মতো খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং নতুন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার সময় তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর অনুসারীরা মনে করেন।

খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা ১৯৭২ সালে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র, সমাজব্যবস্থা ও রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে আকৃষ্ট হয়ে জাসদ-সমর্থিত ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল শাখায় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ছাত্ররাজনীতির এই সময়টি ছিল স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন, আদর্শিক বিতর্ক ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের আন্দোলন-সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর পাঁচবার কারাবরন করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। ১৯৮৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিক আনোয়ার জাহিদ এবং শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর।
দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে যুক্ত ছিলেন। তিনি এনডিপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরে দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
দলীয় নেতৃত্বে থেকে তিনি সংগঠন পরিচালনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এনডিপির সাংগঠনিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দলগুলোর অবস্থান ও জনসমর্থন তুলে ধরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজাও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পাবনা-২ আসনে এনডিপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং
১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি অংশ গ্রহণ করেছেন এবং ওই সময় এনডিপির চেয়ারম্যান হিসেবে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন।
নির্বাচনী রাজনীতির পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের দলের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
আদর্শ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে অবস্থান
খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার রাজনৈতিক দর্শনে আদর্শ, নৈতিকতা, জনসেবা ও মানুষের আস্থার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় । তাঁর নামে প্রচলিত একটি বক্তব্য হলো, “রাজনীতি অর্থের নয়, আদর্শ ও মানুষের বিশ্বাসের লড়াই।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে আদর্শিক অবস্থান ও জনআস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়।
২০০৭ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি অবস্থার সময় তিনি কারাবরণ করেন। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা ছিল। ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তাঁর কারাবরণের ঘটনাকে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এনডিপির মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার রাজনৈতিক জীবন ও নেতৃত্বের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, “খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা শুধু এনডিপির নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর চিন্তা, প্রজ্ঞা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের অনুপ্রেরণা।”
মঞ্জুর হোসেন ঈসার এই বক্তব্যে দলের চেয়ারম্যানের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব থেকে নতুন প্রজন্মের নেতা-কর্মীদের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্র আন্দোলন, আদর্শিক রাজনীতি এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার রাজনৈতিক জীবনও এসব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করে।
তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় যেমন রয়েছে ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে দলীয় নেতৃত্ব, নির্বাচনী রাজনীতি ও কারাবরণের অধ্যায়। এসব অভিজ্ঞতার প্রামাণ্য নথি, সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন এবং ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার সংরক্ষণ করা গেলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গবেষণায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৭৩ বছরে পদার্পণের এই দিনে খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আদর্শিক অবস্থান ও সাংগঠনিক ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর গবেষণা এবং ঐতিহাসিক দলিলের গুরুত্ব অপরিসীম।এনডিপির পরিবার তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান এবং দীর্ঘ সুস্থ জীবন কামনা করেন।