শিক্ষকরা সভ্যতার অগ্রগতির চালিকাশক্তি ও মানসম্পন্ন শিক্ষার চাবিকাঠি। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। এই চিরন্তন সত্যের পেছনে যিনি মূল কান্ডারি তিনি হলেন শিক্ষক। শিক্ষকরা হলেন সভ্যতার উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। মানুষের ভেতরের অন্দকার দূর করে আলোর পথ দেখানোর মহান দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষকরা। তাইতো সত্যিকারের শিক্ষকরা শুধু শ্রেণীকক্ষের পাঠদানকারী নন বরং তারা সভ্যতার অভিভাবক। আগামি প্রজন্মের মনন, গঠন, মূল্যবোধের বিকাশ এবং একটি ইনসাফভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ বির্ণিমানে শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতি বছর ৫ই অক্টোবর সারাবিশ্বে উদযাপিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের এই অসামান্য অবদান কে শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি স্মরন করার জন্যই এই দিবসের আয়োজন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজ মানব সভ্যতা যে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির জয়জয়কার তার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছেন শিক্ষকরাই। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের জ্ঞানতাপসরা সমাজকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। একজন আর্দশ শিক্ষক কেবল পাঠ্য বইয়ের জ্ঞানই বিতরন করেন না, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম, সততা, মানবতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং নৈতিকতার বীজ বুনে দেন। রাষ্ট ও সমাজ যখন কোনো সংকটে পড়ে তখন শিক্ষকেরাই তাদের নৈতিক দিক নির্দেশনা দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। এই অর্থেই তারা সভ্যতার অভিভাবক, যারা নিস্বার্থভাবে সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য সচেষ্ট থাকেন। ব্র্যাড হেনরি বলেছেন “একজন ভালো শিক্ষক আশার আলো জালাতে পারেন, কল্পনা কে উদ্দিপিত করতে পারেন এবং শেখার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পারেন” মানসম্পন্ন ও দক্ষ শিক্ষকের অপরিহার্যতা- বর্তমান যুগে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য মানসম্পন্ন বা গুনগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদান করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। একটি চমৎকার শিক্ষাক্রম বা আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও তা পুর্ণতা পায় না যদি দক্ষ শিক্ষক তা শ্রেনী কক্ষে প্রয়োগ করতে না পারেন। দক্ষ শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিখন পদ্বতি আয়ত্ব করেন। শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ব বোঝেন এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে সাহায্য করেন। মেধা ও মননে সমৃদ্ধ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে সর্বাত্রে প্রয়োজন শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন। বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্টিকে মানবসম্পদ বিবেচনা করে দক্ষতা অর্জনের উপর জোর দিতে হবে। এজন্য শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নের উপর প্রধান্য দিতে হবে। শিক্ষকদের মর্যাদা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: সমাজ জীবনে সকল অবক্ষয়ের সময় সমাজকে সঠিক ভাবে পরিচালনা করার জন্য যারা ভূমিকা রাখেন তাদের অন্যতম পুরোধা হলেন শিক্ষক সমাজ। একদিকে শিক্ষার্থীদের আলো বিতরন করেন অন্যদিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয় দেশ ও সমাজ। শিক্ষকদের সভ্যতার কারিগড় বলা হলেও বাস্তব জীবনে তারা কতটুকু সম্মান এবং সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন তা ভাববার বিষয়। বিশেষ করে আমাদের দেশে শিকক্ষদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখনো কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌছায় নি। যোগ্য ও মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে তাদের উপযুক্ত জীবন যাত্রার মান ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। মান সম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে তাদের উপযুক্ত জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এরিস্টটল বলেছেন, যারা শিশুদের শিক্ষা দেন, তাঁরা বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি সম্মানিত, কারন জন্মদাতা শুধু জীবন দেয়, আর শিক্ষক সুন্দর ভাবে বাঁচার শিল্প শেখান। এ.পি.জে. আব্দুল কালাম বলেছেন, শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত মহৎ পেশা, যা মানুষের চরিত্র, সক্ষমতা ও ভবিষৎ গড়ে তোলে। শিক্ষকরা শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় জ্ঞান সীমাবদ্ধ রাখেন না, তাঁরা শিক্ষার্থীদের মনে জ্বালিয়ে দেন সততা ও মানবতা। একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন আলোকীত সমাজ গঠনে একটি শক্তিশালী শিক্ষক সমাজ গড়ে তোলা আমদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে শিক্ষরা হলেন জাতির আলোকবর্তিতা। ৫ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষকদের মযার্দা রক্ষা করা এবং তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া কোনো করুণা নয় বরং সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সার্থেই তা অপরিহার্য। দক্ষ ও মর্যাদাশীল শিক্ষক সমাজ গড়ে তুলার মাধ্যমে একটি মানসম্পন্ন শিক্ষার ভবিষৎ নিশ্চিত করাই হোক বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গিকার।
এডভোকেট ড. মোঃ আবু তাহের, সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর সিলেট ইন্টারন্যশনাল ইউনিভার্সিটি






