আমার স্বরণীয় দিনগুলোর মধ্যে ১০ এপ্রিল ২০২৬ একটি। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সিলেটের হলরুমে ঐ দিন প্রানের মেলা জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে কবি, সাহিত্যিক ও লেখকদের এক সম্মেলন হয়ে গেল যা দীর্ঘদিন আমার স্মৃতিতে অম্লান থাকবে।
সৃজনশীলতার গুরুত্ব ও মানবিকতার চর্চা শীর্ষক সম্মেলন ২০২৬ এ আমি বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছি। সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড দিদার চৌধুরী। প্রধান আলোচক ছিলেন কবি ও চলচিত্র অভিনেতা এ বি এম সোহেল রশীদ। এছাড়াও অন্যান্য কবি ও সাহিত্যিকগণ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনের সভাপতি কবি জিল্লুন নাহার খান এর সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্ভোধন করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কবি বেল্লাল হাওলাদার। অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তরুণ লেখক ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইমন তালুকদার। বৃহত্তর সিলেটের কবি ও সাহিত্যিকগণ সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শতাধিক কবি ও সাহিত্যিক ও লেখকদের অংশগ্রহণে সম্মেলনটি একটি অসাধারণ মনোমুগ্ধকর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। লেখক ও কবি সাহিত্যিকগণ তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে সমাজ ও দেশকে আলোকিত করতে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। লেখক কবি সাহিত্যিকগণ একটি নিরাপদ স্থিতিশীল ন্যায়ভিত্তিক জ্ঞানভিত্তিক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মানুষের চিন্তাশক্তির বিকাশে ও লেখকদের অবদান অপরিসীম।
মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস শৃঙ্খলা মানবিক মূল্যবোধ নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ চিন্তার বীজ বপন করতেও কবি সাহিত্যিকগণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। কবি সাহিত্যিকদের সৃজনশীলতার মূলে রয়েছে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ। সাহিতা মানুষকে মহান চিন্তা চেতনার প্রতি আকৃষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করে। গভীর জীবনবোধ, উন্নত জীবন, সত্যজীবনের পথে উদ্বুদ্ধ করেন লেখক ও সাহিত্যিকগণ।
খ্যাতিমান লেখক হুমায়ূন আহমেদের একটি উক্তি হলো, যার মধ্যে অন্ধকার থাকে সে কখনো আলো নিয়ে খেলতে পারে না। কবি সাহিত্যিকগণ সব সময় আলো নিয়ে খেলতে পারেন বলেই সকল সামাজিক অবক্ষয়ের সময়ে সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যান। ভোরের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে আলোকিত করে ঠিক তেমনি কবি সাহিত্যিকরা তাদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে সমাজ ও দেশকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন। জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব। মানুষ যখন সীমিত জ্ঞান এর গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে তখন তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও কম থাকে। বুদ্ধির আড়ষ্টতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। মুক্ত চিন্তা ও অবাধ জ্ঞানের চর্চায় মানুষের বুদ্ধি শাণিত হয়। কবি সাহিত্যিক ও লেখকদের সংগঠন কুসংস্কারমুক্ত, যৌক্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। সেরকমই একটি সংগঠন প্রানের মেলা জাতীয় কবিতা পরিষদ বলে আমার কাছে মনে হয়।
বিখ্যাত কলম্বিয়ান লেখক গাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির (১৯৮২) বক্তৃতায় বলেছিলেন মানুষের পরাজয় নেই এজন্য যে তার ভাষা আছে, তা এজন্য যে, তার আত্মা আছে। এই কথার অর্থ হল মানুষের টিকে থাকার বা বিজয়ী হওয়ার মূল শক্তি শুধু বাহ্যিক ভাষা নয়, বরং তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সৃজনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস। মার্কেজ তাঁর বক্তৃতায় আরো বলেছিলেন বার্ধক্য হল নতুন স্বপ্ন না দেখার নাম। আর মানুষের আত্মাই তাকে স্বপ্নের পথে চালিত করে। মৃত্যুই অমোঘ সত্য। মৃত্যুকে মহীয়ান করা যায় সৃজনশীলতার মাধ্যমে। সৃজনশীল কর্মকাণ্ড মানুষকে শত বছর বাঁচিয়ে রাখতে পারে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল (সাঃ) বলেছেন মানুষ মারা গেলে সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিন আমলের সোয়াব মৃত্যুর পরও থাকে। এর মধ্যে একটি হলো সৃজনশীল কর্ম। এই তিনটি আমল হলো সদকায়ে জারীয়া। চলমান দান, মসজিদ মাদ্রাসা, রাস্তা নির্মাণ করা, টিউবেল ইত্যাদি স্থাপন)। ২ উপকারী জ্ঞান (সৃজনশীলতা) এমন জ্ঞান বা লেখালেখি যা ব্যবহার করে মানুষ উপকৃত হয়। ৩. নেক সন্তান বা সুসন্তান যে মা বাবার জন্য দোয়া করে এবং সৎকর্ম করে। সৃজনশীলতা মানুষের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে উৎসাহিত করে। লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের সৃজনশীলতা প্রকাশ এবং মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। মানবিকতার চর্চা মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এবং আবশ্যিক বিষয়। অন্যের কষ্ট অনুভব করা এবং সাহায্যের হাত প্রসারিত করা মানবিকতার মূলকথা যা সমাজের অন্য অপরিহার্য। সততা ন্যায়বিচার ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠে। সৃজনশীলতা মানবিকতা মানুষকে আর্দশ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে। সৃজনশীলতা মানুষকে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের পথ দেখায় এবং সেই পথে চলার শক্তি যোগায়।





