, ,

​৪ ফুটের রাস্তায় বহুতল ভবন: রাজউক পরিদর্শক নাজমুলের নেপথ্য ভূমিকা!

নিউজটি শেয়ার করুন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং সরকারি গেজেটকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজধানীর উত্তরখান এলাকায় এক নজিরবিহীন অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইমারত পরিদর্শক মোঃ নাজমুল হাসান।

আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে মাত্র ৪ ফুট প্রশস্ত রাস্তার পাশে বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দিয়ে তিনি কেবল সরকারের আইনকেই অমান্য করেননি, বরং সমগ্র রাজউক প্রশাসনকে এক প্রকার জিম্মি করে ফেলেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

​বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন: কোথায় রাজউকের নিয়ম?

​ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (২০০৮) এবং সরকারের সর্বশেষ গেজেট অনুযায়ী, যেকোনো ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে রাস্তার ন্যূনতম প্রশস্ততা একটি বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত। রাজউক সূত্র জানায় ৪ ফুট রাস্তার পাশে কোনোভাবেই বহুতল ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ, ইমারত পরিদর্শক মোঃ নাজমুল হাসানের সরাসরি “সহায়ক ভূমিকা” এবং রহস্যজনক নীরবতায় উত্তরখান মাজার রোডের পশ্চিম পাড় ও আর্মি সোসাইটি সংলগ্ন এলাকায় দেদারসে নিয়মবহির্ভূত ইমারত নির্মাণ কাজ চলমান।

​বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ইমারত পরিদর্শক নাজমুলের প্রত্যক্ষ মদদে এসব নির্মাণাধীন ভবনে রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত প্ল্যানের বিবরণ সম্বলিত সাইনবোর্ড বা দৃশ্যমান বর্ণনা ঝোলানো হয়নি—যা ইমারত নির্মাণ আইনের স্পষ্ট পরিপন্থী।

​বদলির অজুহাত ও দায়িত্ব এড়ানোর চাতুর্যতা

​মুঠোফোন তাঁর এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নেন। তিনি জানান, বর্তমানে তিনি উত্তরা থেকে বদলি হয়ে গুলশান কার পার্কিং ভবনে অবস্থিত জোন-৪ এর কার্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। বদলিজনিত এই ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তিনি মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে বা সময় দিতে অস্বীকৃতি জানান।

​তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, বদলির এই ক্রান্তিকালীন সময়ে যেখানে তাঁর পূর্বের কর্মস্থলের পেন্ডিং ফাইল ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার কথা, সেখানে তিনি রাজউকের বিধির বাইরে গিয়ে নতুন কোনো ভবনের গোপন তদারকিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নগর উন্নয়নের এই বিশাল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন না করে, জমির মালিকদের বেআইনি রাজত্বকে পুঁজি করে নিজের আখের গোছানোর জন্যই কি তিনি এই শেষ মুহূর্তেও মরিয়া হয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন?—এমন প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।

​ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তোয়াক্কা না করার দম্ভ

​অনুসন্ধানে জানা যায়, ইমারত পরিদর্শক নাজমুল হাসান সংশ্লিষ্ট জোনের অথরাইজড অফিসার কিংবা কোনো প্ল্যানারকেই তোয়াক্কা করেন না। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুতর এসব বিচ্যুতির তথ্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখেন। মুঠোফোনে তিনি দম্ভের সাথে বলেন, আমি রাজউকের আইনের সব “ফাঁকফোকর” ভালো করেই বুঝি এবং কাউকেই সমীহ করার প্রয়োজন মনে করিনা। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি ইচ্ছে করলেই মাসে ১০-১২ টা মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) করাতে পারেন, আবার কাকে ছাড় দিতে হবে সেটাও তাঁর ব্যক্তিগত এখতিয়ার।

​”শুভঙ্করের ফাঁকি” ও নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট

​নাজমুল হাসানের দাবি অনুযায়ী, উত্তরখান মাজার রোডের পশ্চিম পাড় ও আর্মি সোসাইটি এলাকার বাড়ির মালিকেরা তাঁর একক নির্দেশনায় চলেন। তিনি বাড়ির মালিকদের যেভাবে আইনি ফাঁকফোকর “গুছিয়ে” দেন, মালিকেরা ঠিক সেভাবেই কাজ করেন। জনশ্রুতি আছে এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন হয়। এই সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কারণেই ৪ ফুট গলির ভেতরেও আকাশচুম্বী বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ স্থানীয় রাজউক প্রশাসন অন্ধের ভূমিকা পালন করছে।

​বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি

​একজন সাধারণ ইমারত পরিদর্শকের এমন লাগামহীন ক্ষমতা এবং সরকারি গেজেট উল্টে দেওয়ার ধৃষ্টতা রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক সততাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যেখানে আইন প্রয়োগ করার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে, সেখানে তিনি নিজেই আইন ভাঙার মূল কারিগর ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।