অধ্যক্ষ খান আখতার হোসেন:
বর্ষাকাল এলেই বাংলাদেশে একটা পুরনো দৃশ্য ফিরে আসে। রাস্তায় হাঁটু পানি, জলাবদ্ধতা, ছাত্র-ছাত্রীদের ভেজা ড্রেসে স্কুল-কলেজে যাওয়া। এবারের দৃশ্যটা একটু আলাদা। কারণ এবার সাথে আছে মোবাইল ক্যামেরা, ফেসবুক লাইভ, আর তাৎক্ষণিক ভাইরাল হওয়ার সুযোগ। ২০২৬ সালের এইচএসি পরীক্ষা ঘিরে সেই পুরনো কষ্ট নতুন মোড়কে জাতির সামনে হাজির হয়েছে। আর তার মাঝেই শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্য আগুনে ঘি ঢেলেছে।
১. ঘটনার সূত্রপাত
চলতি বছরের এইচএসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে বর্ষার মাঝেই। কুমিল্লায় একটি কলেজের ছাত্রীদের কোমর পানি ভেঙে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়। বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, যানজট – সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন। ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে আসে। দাবি একটাই, পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হোক।
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী একটি বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যে তিনি নাকি বলেছেন “আজকের প্রজন্ম ফার্মের মুরগি”। এরসাথে যোগ হয়েছে পদার্থ বিজ্ঞানের দুটো ভুল প্রশ্ন।
ছাত্ররা নেমে আসে রাজপথে।
এরপরই শুরু হয় প্রতিক্রিয়া। হাসনাত আব্দুল্লাহ স্টেজে বক্তব্য দেন, এই ফার্মের মুরগি ছাত্ররা যদি না থাকতো তাহলে ২৪ এর আন্দোলনে কেউ শিলং থেকে দেশে ফিরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারতোবা। কেউ লন্ডন থেকে দেশে এসে প্রধানমন্ত্রী হতে পারতো না। এসব বক্তব্য ছাত্রদের আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে। রাজপথে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীকে নাম ধরে গালিগালাজ – সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত।
রুহিন ফারহানার জাতীয় সংসদে প্রশ্নে
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানেই পরীক্ষা হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে প্রশাসন নিজস্ব ক্ষমতায় যেকোনো কেন্দ্রের পরীক্ষা স্থগিত করতে পারে।”
২. প্রশ্নগুলো ঘুরপাক*
সাধারণ মানুষের মনে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রথম প্রশ্ন: দায় কার?
শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে স্পষ্ট করেই বলেছেন পরীক্ষা স্থগিতের ক্ষমতা স্থানীয় প্রশাসনকে দেয়া হয়েছে। তাহলে কোমর পানি ডিঙিয়ে ছাত্রীদের কেন্দ্রে যেতে হলো কেন? প্রশাসন কেন আগে থেকে ব্যবস্থা নিল না? কেন্দ্রের আশেপাশের রাস্তা, যানবাহন, বিকল্প কেন্দ্র – এগুলো দেখার দায়িত্ব কার ছিল? ছাত্ররা রাস্তায় না নামলে কি প্রশাসনের চোখ খুলতো না?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: দাবিটা কী?
আন্দোলনরত অনেকের বক্তব্য পরিষ্কার নয়। কারো দাবি বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। কারো দাবি প্রশ্ন কঠিন হয়েছে, ভুল হয়েছে। আবার অনেকে বলছে, পুরো পরীক্ষাই এক বছর পিছিয়ে দিতে হবে। কিন্তু একটা জাতীয় পরীক্ষা পিছিয়ে দিলে তার প্রভাব কতদূর যায়? বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, বৃত্তি, বিদেশে পড়াশোনা – সব পিছিয়ে যায়।
তৃতীয় প্রশ্ন: প্রস্তুতি কোথায়?
আমাদের সময়েও বর্ষা ছিল। তখন ব্যাগে পলিথিনে করে স্কুল ড্রেস নিয়ে যেত অনেকে। স্কুলে গিয়ে কাপড় বদলে ক্লাস করত। মেয়েদের পিরিয়ড ম্যানেজমেন্ট, বিকল্প রাস্তা, আগের দিন হোটেলে থাকা – এগুলো ব্যক্তিগত প্রস্তুতির অংশ ছিল। আজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসেও যদি আমরা এই মৌলিক প্রস্তুতি না নেই, তাহলে দায় কার?
৩. আন্দোলনের চেহারা আর উত্তেজনা
যে ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা। স্লোগান, রাস্তা অবরোধ, শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ।
এখানে একটি বড় বৈপরীত্য চোখে পড়ে। আন্দোলনের মূল কথা শৃঙ্খলা, সম্মান, ন্যায্যতা। অথচ আন্দোলনের ভাষাতেই শৃঙ্খলার অভাব। দাদার বয়সী একজন শিক্ষককে, একজন জাতীয় নেতাকে নাম ধরে ডাকা, অশ্লীল কটুক্তি করা – এটা কি সেই আন্দোলনের লক্ষ্যকেই দুর্বল করে দিচ্ছে না?
অনেকে বলছেন, “আমরাই তো সরকার ফেলে দিয়েছি।” এই আত্মবিশ্বাস ভালো। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো বড় পরিবর্তন একক কোনো গোষ্ঠীর কাজ নয়। গত আন্দোলনে সারাদেশের মানুষ, অভিভাবক, শিক্ষক, পেশাজীবী সবাই রাস্তায় নেমেছিলেন। সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য বাবা-মা জীবন বাজি রেখেছিলেন। সেই সম্মিলিত শক্তিকে ছোট করে দেখলে আন্দোলন তার নৈতিক ভিত্তি হারায়।
আরেকটি বিষয় হলো “ইনডালজেন্স”। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি দ্রুত মেনে নেওয়া হয়েছে। এটা ভালো দিক। কিন্তু অতিরিক্ত ছাড় দিলে একটা ভুল বার্তা যায় – “রাস্তায় নামলেই সব পাওয়া যায়।” এতে আগামী বছরের পরীক্ষার্থীরাও একই পথ বেছে নেবে। সামান্য সমস্যাতেই আন্দোলন, অস্থিরতা – এটা জাতির জন্য উদ্বেগের।
৪.আমরা হাঁটুপানি ভেঙ্গে গেছি
আমাদের বাবারা মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে গেছেন। কোমর পানি ভেঙে পরীক্ষা দিয়েছেন। আমরাও মাটি রাস্তায় হাঁটুর সমান কাদা ও পানি ভেঙ্গে শাহাপুর স্কুলে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, শাহপুর মধুগ্রাম কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। তখন ফেসবুক ছিল না, সাংবাদিক ছিল না, তাই কষ্টগুলো আড়ালেই থেকে গেছে। এখনকার বাচ্চারা এসি রুমে বড় হয়, প্রাইভেট কোচিং করে, অনলাইনের ক্লাস করে। পরিশ্রমের ধরন পাল্টেছে।
কিন্তু তার মানে কি আগের কষ্টই আদর্শ? না। পৃথিবী এগিয়েছে বলেই নগর পরিকল্পনা আপডেট হওয়া উচিত ছিল। ড্রেনে ময়লা না ফেলা, জলাবদ্ধতা কমানো, পরীক্ষার সময় বিকল্প পরিবহন – এগুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। “আমরা কষ্ট করেছি তাই তোমরাও করো” – এই যুক্তি উন্নয়নের পরিপন্থী।
তবে উল্টো দিকটাও ভাবতে হবে। সুবিধা পেলেই কি দায়িত্ববোধ কমে যাবে? পরিশ্রম, সহনশীলতা, শৃঙ্খলা – এগুলো ছাড়া শুধু ডিগ্রি দিয়ে কি মানুষ হওয়া যায়? পরীক্ষা এক বছর না দিলে আরেক বছর দেওয়া যায়। কিন্তু চরিত্র, সততা, সহনশীলতা একবার নষ্ট হলে তা ফেরানো কঠিন।
৫. অভিজাত কলেজগুলোর নীরবতা
অনলাইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নটরডেম কলেজ, হলিক্রস কলেজ,রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, সেন্ট যোসেফ, আদমজী স্কুল এন্ড কলেজ, রাজউক স্কুল এন্ড কলেজ – এই কলেজগুলোর ছেলে-মেয়েরা কোথায়? তাদের কোনো সাক্ষাৎকার গণমাধ্যমে আসছে না কেন? তারা কি আন্দোলনে নেই? নাকি প্রতিবাদ করার সাহস নেই?
বাস্তবতা হলো, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কালচার আলাদা। কোনো কলেজ সরাসরি রাজনীতিতে যায় না। কোনো কলেজের শিক্ষকরা ভেতরে ভেতরে সমাধানের চেষ্টা করেন। আবার এটাও সত্যি, মিডিয়া সবসময় “এক্সাইটমেন্ট” খোঁজে। শান্তিপূর্ণ আলোচনা, বিকল্প প্রস্তাব – এগুলো ভাইরাল হয় না। তাই মনে হয় শুধু একপক্ষই কথা বলছে।
কিন্তু অভিজাত বলতে যা বোঝায়, তা শুধু রেজাল্ট নয়। নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ, সমস্যা সমাধানের কৌশল – এগুলোও। এই সময়ে বড় কলেজগুলোর উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে যৌক্তিক, শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ দেখানো।
৬. শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য ও ভাষার রাজনীতি
শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব স্থানীয় পর্যায়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ভাষার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের ভাষা নিয়েও প্রশ্ন আছে। “হাসু আপার” উদাহরণ টেনে নিজেদের আক্রমণাত্মক ভাষাকে জায়েজ করা যায় না। আপনি যার বিরুদ্ধে লড়ছেন, তার ভুল দিয়ে নিজের ভুলকে ঢাকা যায় না। আন্দোলনের উদ্দেশ্য যদি হয় একটি সুন্দর, শৃঙ্খলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, তাহলে আন্দোলনের ভাষাও শৃঙ্খলিত হতে হবে। নাহলে সাধারণ মানুষ একাত্ম হবে না।
৭. সমাধানের পথ কোথায়
সমস্যা শুধু একটা পরীক্ষা নয়। সমস্যা সিস্টেমের।
রাষ্ট্রের করণীয়:
1. আগাম প্রস্তুতি: বর্ষার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা।
2. পরিবহন: কলেজগুলো বাসের ব্যবস্থা করতে পারে। সরকার ভর্তুকি দিতে পারে।
3. স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি: কেন্দ্রে পানি থাকলে সাথে পরীক্ষা স্থগিতের ক্ষমতা প্রয়োগ।
4. ক্যালেন্ডার পর্যালোচনা: প্রতি বছর বর্ষার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া যৌক্তিক কিনা ভাবা।
শিক্ষার্থীদের করণীয়:
1. ব্যক্তিগত প্রস্তুতি: বিকল্প রাস্তা, অতিরিক্ত কাপড়, নিরাপত্তার পরিকল্পনা।
2. শান্তিপূর্ণ ভাষা: দাবি আদায়ের জন্য গালিগালাজ নয়, যুক্তি দরকার।
3. দায়িত্ববোধ: একটা পরীক্ষা জীবন নয়। ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠা তার চেয়ে বড়।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের করণীয়:
সন্তানদের শুধু এ+ এর জন্য চাপ না দিয়ে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া। কষ্টকে অস্বীকার না করে, কষ্টের মধ্যে সমাধান খোঁজার মানসিকতা তৈরি করা।
৮. শেষ কথা: মানুষ হওয়াই বড় পরীক্ষা
এইচএসসি একটি পরীক্ষা। জীবনের একটি অংশ। কেউ এক বছর পিছিয়ে দিলেও জীবন থেমে থাকে না। অন্য পেশা, অন্য সুযোগ আছে।
কিন্তু মানুষ হিসেবে গড়ে না উঠলে সব ডিগ্রিই অর্থহীন। সততা, শৃঙ্খলা, অন্যের কষ্ট বোঝা, রাষ্ট্রের নিয়ম মানা, আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে দাঁড়ানো – এগুলোই আসল শিক্ষা।
আজকের উত্তেজনা, উত্তপ্ত রাজপথ একদিন ঠান্ডা হবে। কিন্তু থেকে যাবে আমরা কী শিখলাম। সরকার শিখলো দুর্যোগ মোকাবিলায় আরো প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রশাসন শিখলো দায়িত্ব এড়ানো যায় না। শিক্ষার্থীরা শিখলো প্রতিবাদের ভাষা আর আন্দোলনের শৃঙ্খলা। আর আমরা সবাই শিখলাম – উন্নয়ন শুধু ফ্লাইওভার আর মেট্রো নয়, উন্নয়ন হলো মন-মানসিকতা, পরিকল্পনা আর দায়িত্ববোধের।
বৃষ্টি থেমে যাবে। পানি নেমে যাবে। কিন্তু এই সময়ের তর্ক-বিতর্ক যদি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো দায়িত্বশীল, আরো সহনশীল মানুষ হতে সাহায্য করে, তবেই এই উত্তপ্ত রাজপথের কোনো অর্থ থাকবে।
নইলে আমরা আবার পরের বর্ষায়, পরের পরীক্ষায় একই জায়গায় এসে দাঁড়াবো। শুধু অভিযোগ পাল্টাবে, সমাধান পাল্টাবে না।
পুনশ্চঃ পদার্থ বিজ্ঞানের ভুল প্রশ্নে যাদের দায় তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
লেখক: পরিচালক অব., শ্রম অধিদপ্তর ও কলামিস্ট
ইমেইল : Khanakhtargangchil2000@gmail.com







