, ,

রিয়েল এস্টেট বিক্রয় ও বিপণনে কনজ্যুমার ডিউরেবলসের কৌশল এখন অপরিহার্য

নিউজটি শেয়ার করুন

ডিম.এম. সাকলায়েন: আধুনিক অর্থনীতিতে রিয়েল এস্টেট কেবল জমি, ইট-পাথর বা অবকাঠামো নির্মাণের ব্যবসা নয়; এটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগগুলোর একটি। এই বাস্তবতায় আবাসন খাতে ক্রেতার আচরণ, প্রত্যাশা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে শুধু জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেসের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বিক্রয় বাড়ানোর প্রচলিত কৌশল এখন আর যথেষ্ট নয়। কনজ্যুমার ডিউরেবলস পণ্যের বিক্রয় ও বিপণনে ব্যবহৃত আধুনিক কৌশল রিয়েল এস্টেট খাতে প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।

গ্রিনল্যান্ড টাউন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ডিএমডি ও সিইও ডি. এম. সাকলায়েনের মতে, কনজ্যুমার ডিউরেবলস এবং রিয়েল এস্টেটের বিক্রয় প্রক্রিয়ার মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেতাকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, পণ্যের মান, ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ক্রয়-পরবর্তী সেবার বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

সাধারণত ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন কিংবা স্মার্টফোনের মতো পণ্যকে কনজ্যুমার ডিউরেবলস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব পণ্য একবার কেনার পর দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক স্পেস কিংবা রিসোর্ট প্রপার্টি একজন মানুষের জীবনের অন্যতম বড় আর্থিক বিনিয়োগ এবং বহু বছর ধরে ব্যবহারের সম্পদ।

বিশ্বব্যাপী নগরায়ণ এবং বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে আবাসন খাতের পরিধি বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রেতার সচেতনতা ও চাহিদার ধরনও বদলে যাচ্ছে। এখন ক্রেতারা শুধু একটি জায়গা বা ভবন কিনতে চান না; তারা পণ্যের স্থায়িত্ব, জীবনযাত্রার সুবিধা, নিরাপত্তা, পরিবেশ, কমিউনিটি, বিক্রয়-পরবর্তী সেবা এবং ব্র্যান্ডের ওপর আস্থাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।

কনজ্যুমার ডিউরেবলস ও রিয়েল এস্টেট—দুই খাতেই ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই আর্থিক ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। চাল, ডাল বা দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের মতো রিয়েল এস্টেটের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া সম্ভব নয়। এখানে পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিষয় থাকে।

এ ছাড়া এগুলো দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্য সম্পদ। একটি আধুনিক স্মার্টফোন বা ফ্রিজ কয়েক বছর ব্যবহার করা হলেও একটি ফ্ল্যাট, প্লট বা রিসোর্ট প্রপার্টি কয়েক দশক ধরে ব্যবহার করা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্ম সম্পদ হিসেবে টিকে থাকে।

রিয়েল এস্টেট কেনার আগে ক্রেতারা একাধিক প্রকল্প ও বিকল্প যাচাই করেন। প্রকল্পের অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, সুযোগ-সুবিধা, মূল্য, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, নির্মাণমান এবং আইনি কাগজপত্রসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেন। এই বাস্তবতায় কনজ্যুমার ডিউরেবলসের বিক্রয় ও বিপণন দর্শন রিয়েল এস্টেটে প্রয়োগ করা গেলে ক্রেতার আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি বিক্রয় প্রক্রিয়াকেও আরও কার্যকর করা সম্ভব।

কনজ্যুমার ডিউরেবলসের আধুনিক বিপণনে শুধু পণ্যের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয় না; বরং পণ্যটি ক্রেতার জীবনে কী ধরনের সুবিধা ও অভিজ্ঞতা তৈরি করবে, সেটিও তুলে ধরা হয়। রিয়েল এস্টেটের ক্ষেত্রেও একই কৌশল কার্যকর হতে পারে। শুধু কত বর্গফুট জায়গা, কয়টি বেডরুম বা কী ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে—এসব তথ্যের পাশাপাশি প্রকল্পের লাইফস্টাইল ভ্যালু তুলে ধরা প্রয়োজন।

আবাসিক প্রকল্পে নিরাপত্তা, আধুনিক নাগরিক সুবিধা, শিশুদের খেলার জায়গা, সবুজ পরিবেশ ও সমৃদ্ধ কমিউনিটির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। একইভাবে রিসোর্ট বা বাণিজ্যিক প্রকল্পে মানসিক প্রশান্তি, অবকাশযাপনের সুযোগ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা যেতে পারে। অর্থাৎ, একটি ফ্ল্যাটকে শুধু একটি নির্মিত কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবারের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করাই আধুনিক বিপণনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

কনজ্যুমার ডিউরেবলস কেনার সময় ক্রেতারা যেমন ব্র্যান্ড, ওয়ারেন্টি ও পণ্যের স্থায়িত্ব বিবেচনা করেন, তেমনি রিয়েল এস্টেটের ক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন আইনি নিরাপত্তাকে। নির্ঝঞ্ঝাট মালিকানা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, মিউটেশন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তরের নিশ্চয়তা ক্রেতার আস্থা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।

রিয়েল এস্টেট বিপণনে আইনি স্বচ্ছতা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং এটি ক্রেতার আস্থা তৈরির মৌলিক উপাদান। কারণ আইনি জটিলতার আশঙ্কা থাকলে ভালো প্রকল্পও ক্রেতার কাছে আকর্ষণ হারাতে পারে।

কনজ্যুমার ডিউরেবলস খাতে কিস্তি বা সহজ অর্থায়ন ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। রিয়েল এস্টেটের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এককালীন অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি নমনীয় দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি, ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহজ শর্তে হোম লোন বা প্রপার্টি ফাইন্যান্সিংয়ের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

এ ছাড়া প্রাথমিক বুকিং, ডাউন পেমেন্ট ও কিস্তির ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় ও স্বচ্ছ কাঠামো ক্রেতাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব সুবিধার শর্তাবলি স্পষ্টভাবে জানানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানের ক্রেতারা অনেক সময় কোনো প্রকল্পের সাইটে যাওয়ার আগেই অনলাইনে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। ফলে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মে তথ্যসমৃদ্ধ কনটেন্ট থাকা জরুরি। প্রকল্পের 3D স্থাপত্যিক নকশা, ড্রোন ভিডিও, নির্মাণকাজের নিয়মিত আপডেট এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পের ভিজ্যুয়াল উপস্থাপন ক্রেতার আগ্রহ বাড়াতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা VR এবং সরাসরি সাইট ভিজিটের সমন্বিত ব্যবস্থা থাকলে ক্রেতা প্রকল্পের অবস্থান, নকশা ও নির্মাণমান সম্পর্কে আরও বাস্তব ধারণা পেতে পারেন।

কনজ্যুমার ডিউরেবলসের মতো রিয়েল এস্টেটেও বিক্রয় বা হস্তান্তরের পর গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। বরং এখান থেকেই দীর্ঘমেয়াদি কাস্টমার রিলেশনশিপের সূচনা হতে পারে। রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিক্রয়োত্তর রক্ষণাবেক্ষণ সেবা এবং প্রপার্টি ম্যানেজমেন্টের মতো সুবিধা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়াতে পারে।

একজন সন্তুষ্ট পুরোনো ক্রেতা ভবিষ্যতে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি প্রকল্পের ক্রেতা হওয়ার পাশাপাশি নতুন ক্রেতা তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। ফলে রেফারেল মার্কেটিংও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং একই এলাকার একাধিক আবাসিক, প্লট, বাণিজ্যিক ও রিসোর্ট প্রকল্পের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ফলে প্রতিটি প্রকল্পের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা ক্রেতার কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে বর্তমান ক্রেতারা আগের তুলনায় অনেক বেশি তথ্যনির্ভর। তারা বাজারদর তুলনা করেন, আইনি কাগজপত্র যাচাই করেন, ডেভেলপারের পূর্ববর্তী প্রকল্পের রেকর্ড দেখেন এবং অনলাইনে বিভিন্ন মতামত ও তথ্য অনুসন্ধান করেন। এ কারণে শুধু বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার পরিবর্তে তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে শিক্ষিত করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করা আধুনিক রিয়েল এস্টেট বিপণনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

রিয়েল এস্টেট একটি উচ্চ মূলধনী ব্যবসা। প্রকল্পের নির্মাণকাজ সচল রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক নগদ প্রবাহ প্রয়োজন। পরিকল্পিত ও কার্যকর বিক্রয় ও বিপণন ব্যবস্থা না থাকলে প্রত্যাশিত বুকিং নাও আসতে পারে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই বিক্রয় ও বিপণনকে শুধু বিজ্ঞাপন বা বুকিং সংগ্রহের কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রকল্প পরিকল্পনা, মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন, ক্রেতা ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রয়োত্তর সেবার সঙ্গে সমন্বিত একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে বিপণনকে বিবেচনা করতে হবে।

রিয়েল এস্টেট মূলত মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি খাত। তাই এখানে পণ্যের বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি আস্থা, স্বচ্ছতা, সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি।

কনজ্যুমার ডিউরেবলস খাতের আধুনিক বিক্রয় ও বিপণন কৌশল—জীবনযাত্রাকেন্দ্রিক প্রচারণা, ব্র্যান্ড আস্থা, আইনি স্বচ্ছতা, সহজ অর্থায়ন, ডিজিটাল উপস্থাপন এবং বিক্রয়োত্তর সেবা—রিয়েল এস্টেট খাতে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রেতার আস্থাও শক্তিশালী হতে পারে।

দিনশেষে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু জমি বা ভবন নয়; ক্রেতার আস্থা। যে প্রতিষ্ঠান এই আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে এবং আধুনিক বিপণন কৌশলের সঙ্গে তা যুক্ত করতে পারবে, পরিবর্তনশীল আবাসন বাজারে তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

ডি. এম. সাকলায়েন
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও
সিইও
গ্রীনল্যান্ড টাউন ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড