বহুল আলোচিত ওসমান হাদী হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ এমনকি কোমলমতি শিশুদের উপস্থিতিতে এবং তাদের মুখে স্বতঃস্ফূর্ত শ্লোগান ছিল “যেখানে দেখবে বাকশাল, শা…. মা…য়া ছিঁড়ে ফেল”।
প্রকাশ্য জনসমাবেশে সরকারের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের দ্বায়িত্বশীল নেতা কর্তৃক ঢাকসুকে মাদকসেবী ও পতিতাদের আড্ডাখানা বলা কিংবা কর্মজীবী নারীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বেশ্যা’ আখ্যা দেওয়া। সরকারী দলের এক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে সন্তানের বয়সী তরুন এনসিপি নেতা কোনও এক জনসমাবেশে “চ্যাটে… ল” বলে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করা, এসবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে।
রাজনীতিতে স্লোগান কখনোই নিরীহ শব্দমালা নয়। স্লোগান আসলে ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষের প্রথম অস্ত্র, প্রতিবাদের প্রথম উচ্চারণ। ইতিহাস বলে, সঠিক ভাষার স্লোগান মানুষের ভয় ভাঙে, আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চার করে এবং সময়ের সীমা পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। আবার ভুল ভাষার স্লোগান আন্দোলনকেই বিতর্কিত করে তোলে, নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয় এবং সমাজে ঘৃণা ও সহিংসতার বীজ বপন করে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ২০২৪এর ৫ আগষ্টের পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে ব্যবহৃত বহু স্লোগান সেই দ্বিতীয় ধারাটিকেই শক্তিশালী করছে। প্রতিবাদের ভাষা ক্রমে রুচিহীনতা, অশ্লীলতা এবং প্রকাশ্য সহিংসতার আহ্বানে পরিণত হচ্ছে। যা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, পুরো সমাজের শিক্ষা, মূল্যবোধ ও মানবিক মানদণ্ডকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার মহান জাতীয় সংসদেও সংসদীয় আচরণেও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
একসময় জামায়াত-শিবিরবিরোধী আন্দোলনে শোনা যেত-‘একটা দুইটা শিবির ধর, সকাল-বিকাল নাশতা কর’। এখন সেই সহিংস স্লোগানের জায়গা দখল করেছে আরও ভয়াবহ ভাষা-‘একটা একটা লীগ ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’। রাজনৈতিক মিছিলে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এই প্রবণতা নতুন নয়, কিন্তু এর ভাষা ও তীব্রতা যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো,এই ধরনের স্লোগান শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে, যেখানে মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধ বিকশিত হওয়ার কথা, সেখানেও কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল স্লোগান শোনা যাচ্ছে। এমনকি এই ধারাবাহিতায় মহান জাতীয় সংসদেও সংসদীয় আচরণে পরবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মানসিক গঠন নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
একজন সংসদ সদস্য ও একটি দলের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব কোনও এক রাজনৈতিক সভায় নারী-পুরুষের বিশাল উপস্থিতিতে তার বক্তব্যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মহুর্তকে “পতনের সময়” উল্লেখ করে তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “নব দম্পতির বাসররাতে রতিক্রিয়ায় প্রথমবার বীর্যপতনের সময় পুরুষের যে সুখানুভূতি হয়, হাসিনার পতনে ঠিক সেই রকম সুখানুভূতি হয়েছিল।”
এসব শুনে ও দেখে আমাদের মনে ভয়ের সৃষ্টি হয়। এই নতুন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভাষা ও সংস্কৃতিতে যে নতুনত্ব বা পরিবর্তনের ধারা সূচিত হতে চলেছে, তা থেকে আমরা যা পাচ্ছি, সেটা কতটা হজম করা সম্ভব?
রাজনৈতিক মিছিলে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার ভাষা নতুন নয়, স্লোগানে স্ল্যাং ব্যবহারও নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্লোগানের নামে যে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে, তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, সমাজ, শিক্ষা ও সামগ্রিক মূল্যবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে ব্যবহৃত কিছু স্লোগান স্লোগানদাতাদের রুচি, শিক্ষা ও নৈতিক বোধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। বিশেষ করে আশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই স্লোগানগুলোর অনেকগুলো শোনা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, যেখানে জ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির চর্চা হওয়ার কথা।
২০২৫ সালের ৯ জুলাই পুরান ঢাকায় লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ নামে এক ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে মিছিল হয়। এসব মিছিলে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে এমন কিছু অশ্লীল স্লোগান দেওয়া হয়,যার লিখিত রূপ সংবাদপত্রে প্রকাশযোগ্য নয়। যেমন ‘এক দুই তিন চার, তারেক জিয়ার পু…. মার’, ‘টিনের চালে কাউয়া, তারেক জিয়া শা…য়া।’ যে শব্দ সংবাদমাধ্যমে লেখা যায় না, সেই শব্দ সমস্বরে উচ্চশিক্ষিত ছাত্রসমাজ কীভাবে উচ্চারণ করতে পারে এই প্রশ্ন যেমন জরুরি, তেমনি এসব স্লোগানদাতাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়েও সংশয় তৈরি হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ স্লোগানগুলোর একটি হলো ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’। ২৪ এর জুলাইয়ে খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই এই স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে। এর একটি তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য। যেখানে তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা চাকরি পাবে না তো কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?’ এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে প্যারোডি বা ব্যঙ্গের নামে যে স্লোগানটি দেওয়া হয়, তা ছিল গভীরভাবে সমস্যাযুক্ত। কারণ ‘রাজাকার’ শব্দটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণিত শব্দগুলোর একটি। যারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর হিসেবে এই দেশের মানুষের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। তাদের পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে বা অন্যকে যুক্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রতিবাদের ভাষা মানেই যা খুশি বলা নয়। ব্যঙ্গ করার স্বাধীনতা মানেই জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়। প্রতিবাদ মানে আরেকজন মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা নয়, সহিংসতা উসকে দেওয়া নয়।
স্লোগান আসলে মিছিলের কবিতা। কখনো অন্ত্যমিল থাকে, কখনো থাকে না। কিন্তু ভালো স্লোগানে থাকে ঝংকার, শক্তি ও উদ্দীপনা। যেমন ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, কিংবা ‘রাষ্ট্র ভাষা রাষ্ট্র ভাষা, বাংলা চাই বাংলা চাই’। এসব স্লোগান যুগে যুগে মানুষকে আন্দোলনে টেনে এনেছে।
‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্লোগানের ঐতিহাসিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’, ‘জয় জয় হবে জয়, বাংলার হবে জয়’ এসব স্লোগান কেবল শব্দ নয়, ইতিহাসের অংশ।
স্লোগানের ভাষা বিশ্লেষণ করলে একটি সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই স্লোগানের সঙ্গে জনরুচির প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিটি সমাজের নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড রয়েছে। ইউরোপ বা আমেরিকায় যে ভাষা বা স্ল্যাং স্বাভাবিক, বাংলাদেশে তা নাও হতে পারে। বন্ধুমহলের রসিকতা কিংবা ব্যক্তিগত রাগের ভাষা কখনোই জনসমাবেশের স্লোগান হতে পারে না।
অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের রাজনীতির ও স্লোগানের ভাষা ক্রমে অশ্লীলতা ও সহিংসতায় পর্যবসিত হচ্ছে।
অধ্যাপক ফাহমিদুল হক একটি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, স্লোগানে গালির প্রথম বড় উপস্থিতি দেখা যায় ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। জেন-জির প্রকাশভঙ্গিতে গালির ব্যবহার নতুন নয়, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এর লাগামহীন ব্যবহার এখন বিরক্তিকর পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রাজনৈতিক স্লোগান সমাজের জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ। অনেক সময় এর পেছনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, সুশাসনের অভাব ও গণতন্ত্রহীনতাও কাজ করে। কিন্তু কোনো স্লোগান ও রাজনীতির ভাষা বা বক্তব্যের শব্দমালা যেন সহিংসতা উসকে না দেয়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে না পারে, ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না হয়,এই ন্যূনতম দায়িত্ব আন্দোলনকারীদেরই নিতে হবে।
প্রতিবাদের ভাষা যত শক্তিশালী হোক, তা যদি মানবিকতা ও নৈতিকতার সীমা ভেঙে ফেলে, তবে সেই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি করে।
রাজনীতিতে স্লোগান থাকবে-থাকবেই। কিন্তু সেই স্লোগানের ভাষা যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কুলষিত না করে- যেন ইতিহাসের দায় এড়িয়ে না যায়, সমাজের জনরুচিকে আহত না করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লজ্জার উত্তরাধিকার হয়ে না থাকে,এই বোধটুকুই আজ সবচেয়ে জরুরী।
#
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক







