, ,

মানবেতর জীবন নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা মিলছে না ২০ বছর চাকরি করেও

নিউজটি শেয়ার করুন

মানুষের জীবনে মা-বাবার পর সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব যাঁরা ফেলেন, তাঁদের অন্যতম শিক্ষক। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেন, ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেন এবং ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার পথ দেখান। তাই শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়, এটি একই সঙ্গে জ্ঞান, দায়িত্ব, নৈতিকতা ও মানবিকতার এক মহৎ অঙ্গীকার। শিক্ষকের নিজের মর্যাদার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষককে শুধু পরীক্ষার ফলাফল তৈরির যন্ত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল খারাপ হলে তার দায় কেবল শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক অবস্থা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষাসামগ্রী, উপস্থিতি, পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক পরিবেশসহ অনেক বিষয় শিক্ষার ফলাফলের সঙ্গে জড়িত। তাই শিক্ষকের কাজকে মূল্যায়ন করতে হলে একটি সামগ্রিক কাঠামো প্রয়োজন।
বাংলাদেশে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের একজন শিক্ষক বহু সময় শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, তিনি স্থানীয় সমাজের একজন পরামর্শদাতা, অভিভাবক ও আলোকিত মানুষ হিসেবেও ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষকতার পেশাকে আরও আকর্ষণীয়, সম্মানজনক ও পেশাগতভাবে শক্তিশালী করার জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন। যোগ্য তরুণদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হলে তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, পেশাগত উন্নতির সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দেশের সব নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ নন-এমপিও (বেতনবিহীন) শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ। সংগঠনটির এক দফা দাবি হলো—স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে একযোগে এমপিওভুক্ত করতে হবে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে সংগঠনের নেতারা বলেন, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ৫ হাজার ৩৩২টি নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পাঠদান ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
তাদের দাবি, কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছর বা তারও বেশি। অনেক শিক্ষক-কর্মচারী বিনা বেতনে চাকরি করে অবসরে গেছেন। আবার কেউ কেউ কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এতে তাঁদের পরিবারগুলো আর্থিক সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনের মধ্যে পড়েছে বলে সংগঠনটির নেতারা উল্লেখ করেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতনবঞ্চনার অবসান এবং তাঁদের পরিবার-পরিজনের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্তির প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করতে হবে। কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাংলাদেশ নন-এমপিও (বেতনবিহীন) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা অংশ নেন।
দেশের নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেক শিক্ষক ২০ বছর ধরে চাকরি করেও বেতন পান না। পরিবারের কাছেও তাঁরা এখন অবজ্ঞার পাত্র। অনেকে জীবন বাঁচাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি টিউশনি, কেউ কৃষিকাজ, কেউবা মুদি দোকান করছেন। এর পরও তাঁরা সঠিক সময়ে স্কুলে যান, শিক্ষার্থীদের পড়ান। বিভিন্ন শিক্ষক সমিতির সূত্র মতে, দেশে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এর মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত ১৬ বছরে নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে নানা সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় এমপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এমপিদের ডিও লেটারের প্রভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবেও প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়েছে।
ফলে বিএনপি সরকারের সময় প্রতিষ্ঠিত বহু প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যাদের অনেকেই দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বঞ্চনার চক্রে ঘুরছে।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। তবে বর্তমান সরকার সেই তালিকা ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে নারাজ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেই তালিকা ফের যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে আরো আবেদন নেওয়া হবে। পরে নতুন ও পুরনো সব আবেদন একসঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। জানা যায়, এমপিওভুক্তির জন্য গত বছরের ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিন হাজার ৬১৫টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ছিল নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের ৮৫৯টি, মাধ্যমিক পর্যায়ের এক হাজার ১৭০টি, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬৮৭টি, স্নাতক (পাস) পর্যায়ে ৪৪০টি এবং স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ৪১৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিগগিরই নতুন এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন আহবান করা হবে। পাশাপাশি আগে যে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল, সেখান থেকেও যাচাই-বাছাই করা হতে পারে। কিংবা নতুন আবেদন চাইলেও আগে যাঁরা যোগ্য ছিলেন, তাঁরা স্বাভাবিকভাবে এবারও যোগ্য হবেন। এখন যেহেতু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায়, তাই তারা নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ রয়েছে।’
অনেক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কারণে এমপিও দেওয়া হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের বাঁচাতে হলে নতুন এমপিওভুক্তি দিতে হবে। এখনো অনেক শিক্ষক এমপিওভুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন করছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মানবিক প্রধানমন্ত্রী। এ অবস্থায় শিক্ষকরা রাজপথে থাকবেন তা আমাদের কাম্য নয়। আশা করছি, অবিলম্বে সরকার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করবেন।’
শিক্ষকদের অভিযোগ, একই প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁরা বেতন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অনেক শিক্ষক ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে পাঠদান করলেও নিয়মিত বেতন কাঠামোর অভাবে আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
দেশে চালু থাকা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা। ১৯৮৪ সাল থেকে এই মাদরাসার যাত্রা শুরু। ১৯৯৪ সালে একই পরিপত্রের মাধ্যমে গড়ে ওঠা রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা মাসে ৫০০ টাকা ভাতা পেতে শুরু করেন। সেই রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়গুলো এখন সরকারি। তবে রেজিস্ট্রিকৃত স্বল্পসংখ্যক স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা তিন হাজার ৩০০ টাকা ভাতা পান। তবে বেশির ভাগ শিক্ষকই তা পান না।
তবে গত বছরের ৩ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার এমপিও আবেদন নেওয়া হয়। জানা যায়, বর্তমানে দেশের ৯৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই এমপিওভুক্ত। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়েও বৈষম্য রয়েছে। তাঁরা সরকারি শিক্ষকদের মতো সব ধরনের সুবিধা পান না। তাঁরা শুধু মূল বেতন পান। আর বাড়িভাড়া আগে সাড়ে ৭ শতাংশ পেলেও আগামী জুলাই থেকে ১৫ শতাংশ পাবেন। এ ছাড়া চিকিৎসা ভাতা হিসেবে মাত্র ৫০০ টাকা পান। আর উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।