, ,

বেগম জিয়া এবং বাংলাদেশের নারী শিক্ষায় তার অবদান

নিউজটি শেয়ার করুন

(“১৯৯১-৯৬ মেয়াদে স্টাইপেন্ড ও বিনামূল্যে মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নারী শিক্ষায় ঐতিহাসিক অগ্রগতি ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেন সাহসী নেতৃত্বে জাতীয় পরিবর্তন।”

বেগম খালেদা জিয়া বাংলার এক অবিসংবাদিত নেত্রী। এক সরলা গৃহবধূ থেকে হয়েছে একটি দেশের সরকার প্রধান। কথায় আছে ” নারীরাই নারীর প্রধান শত্রু” কিন্তু বেগম জিয়া এই প্রবাদ বাক্যটি ভুল প্রমাণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন একজন নারী চাইলেই শত বাঁধা পেরিয়ে নিজের জীবন যেমন আলোকিত করতে পারেন তেমনি পারেন শত শত নারীকে আলোকিত করতে। আমরা জানি,” জ্ঞানই আলো” আর এই জ্ঞানের আলোকে বাংলার অলিগলির নারীগৃহে পৌঁছে দিতে বেগম জিয়ার অবদান বেগম রোকেয়ার পরেই স্মরনীয়।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রতীকী নেত্রী, যিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন এবং জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের পর গৃহিণী জীবন কাটালেও ১৯৮১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল)-এর সভানেত্রী হন এবং ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা সংগ্রাম, জয়-পরাজয়, জেল-কারাবাস এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। তিনি নারীর নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ও শক্তিশালী করেছিল বাংলাদেশের রাজনীতিকে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশের নারীর শিক্ষায় অবদান অনস্বীকার্য। বেগম জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর শক্ত অবস্থানের প্রতীক হলেও তাঁর সরকারের সময় নারীর শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষা খাতে একাধিক সংস্কার ও প্রণোদনা চালু করা হয়, যার ফলে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার প্রবেশ ও অব্যাহত থাকা দুটিতে ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়।

শিক্ষা খাতে নীতিগত সংস্কার করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার সরকার জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাঁর শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষা সব শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক করা হয় এবং মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে পর্যন্ত শিক্ষা বিনামূল্যে করা হয়েছিল, যাতে পরিবারগুলো মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহিত হয়। এই ধরণের নীতি নারীর সাক্ষরতা এবং স্কুলে উপস্থাপনা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
১৯৯৪ সালে তাঁর সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল Female Secondary School Assistance Project (FSSAP) বা মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল সহায়তা প্রকল্প। এই প্রকল্পটি শিশুমেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা চালিয়ে নিয়ে যেতে প্রণোদনা হিসেবে সরকার ও বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ কিছু আন্তর্জাতিক সহযোগীর অর্থায়নে stipends বা উপবৃত্তি প্রদান করত। এই প্রকল্পে মেয়েদের শ্রেণি ৬ থেকে ১০ পর্যন্ত উপস্থিতি, উপস্থিতি ও গ্রেড ধরে রাখার শর্তে আর্থিক অনুদান দেওয়া হত এবং প্রারম্ভিক বছরগুলোতে এই প্রকল্পের আওতায় মাসিক অল্প পরিমাণ টাকা উপবৃত্তি প্রদান শুরু হয়েছিল।

শিক্ষায় প্রবেশ ও সফলতার পরিসংখ্যানসমূহ
খালেদা জিয়ার শাসনামলে শিক্ষার প্রবেশ ও সফলতার হার বৃদ্ধির আংশিক প্রমাণ দেখা গেছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মাত্রা অনুযায়ী গড়ে শিশুদের শিক্ষা মাত্রা দুই বছরের কাছাকাছি ছিল এবং প্রতি তিনটি ছেলের বিপরীতে একটি মেয়ে স্কুলে উপস্থিত থাকত, অর্থাৎ মেয়েদের শিক্ষার প্রবেশ তেমনটা ছিল না।
তবে ৯০ দশকের মধ্যভাগে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। ১৯৯৫ সালে শিক্ষাবোর্ড পরীক্ষায় (SSC) পাসের হার ছিল স্কুলে উপস্থিত শিক্ষার্থীর ৭৩.২% এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে পাসের হার প্রায় ৭১.৫৮% পৌঁছেছিল। এটি প্রমাণ করে যে শিক্ষার ভিতর প্রবেশ ছাড়াও মেয়েরা সফলভাবে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করছে।
বিশ্বব্যাংক সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে, FSSAP-এর কারণে ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে হাই স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের এনরোলমেন্ট প্রায় তিনগুণ বেড়ে যায়, যা সম্ভাব্যভাবে খালেদা জিয়ার অর্থায়িত নীতিগুলোর সাথে সম্পর্কিত। এতে অনেক দরিদ্র পরিবারে মেয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা নিতে আগ্রহী হয়। বাল্য বিবাহ রোধ হয় এবং এই নারী শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারের হাল ধরে দারিদ্র্যতা নিরসনে এগিয়ে আসে। এতে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কথাটি অনেকাংশেই সত্যি হয়,” তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দিব।”
শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর ছিলেন বেগম জিয়া। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ে ১৯৯৪ সালে শিক্ষা বাজেট প্রায় ৬০% বৃদ্ধি পায়, যা অন্যান্য সরকারি বাজেট খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দের মধ্যে ছিল এবং এর লক্ষ্য ছিল স্কুল, শিক্ষা অবকাঠামো, শিক্ষকের সংখ্যা ও শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন। এই বরাদ্দ বাড়ানোর ফলে শিক্ষা খাতে সাধারণ জনগণের প্রবেশ আরও সহজ হয়।

নারী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন বেগম জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। শিক্ষা শুধু বইয়ের জ্ঞান নয় বরং সামাজিক সংস্কার ও ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়া। খালেদা জিয়ার নীতিমালায় মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি প্রবলভাবে বৃদ্ধির ফলে বাল্যবিবাহের হার কমতে সহায়তা পেয়েছিল, পরিবারগুলোকে মেয়েদের পড়াশোনায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়েছিল এবং মেয়েরা উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। যদিও এই দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল শুধুমাত্র নীতির বদলে সামাজিক পরিবর্তনের অংশ, তবুও শিক্ষা নীতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া রাজধানী ও গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যবধান কমে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে উপসহारा প্রাপ্ত পরিবারগুলোর মেয়েরা স্কুলে আসতে আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হয়ে ওঠে, যখন stipend বা উপবৃত্তি প্রকল্পটি তাদের পরিবারকে মেয়েকে পড়াতে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে।
বৈশ্বিক উন্নয়ন সূচকে নারীর শিক্ষা।

বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকে নারী শিক্ষার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছিল, যার মধ্যে একটি বড় ভূমিকা মেয়েদের stipend প্রকল্প ও মেয়েদের স্কুলে অধিক প্রবেশ সহজ করার মত নীতি ছিল। এই সময়ের মধ্যে মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়, শিক্ষার অভিগম্যতা বাড়ে এবং পরিবারগুলো মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব গ্রহণ করে।

তবে এই নীতিগুলির বাস্তবায়নে কিছু সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা ছিল। stipend বা উপবৃত্তি প্রকল্পে অনিয়ম, কিছু অঞ্চলে সরবরাহ অস্থিতিশীলতা, এবং শুধুমাত্র stipend বা উপবৃত্তি প্রদান সবসময় উচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে না।এমন প্রশ্নগুলো তুলেছিল বিশ্লেষকরা। এর বাইরে, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেও মেয়েরা মাধ্যমিক পর্যায়ে পরার পথে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হত, যা সম্পূর্ণভাবে নীতিগত উদ্যোগ দ্বারা সমাধান সম্ভব নয়।

খালেদা জিয়ার সরকারের সময় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও অপ্রত্যক্ষভাবে নারীর অংশগ্রহণে বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হয়। মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার প্রবেশ সহজ হওয়ায় তারা পরে উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত কোর্সে প্রবেশের সুযোগ পায়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি নারীর কর্মসংস্থান, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।

সার্বিকভাবে দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়ার সরকার মেয়েদের শিক্ষায় প্রবেশ, উপস্থিতি এবং পরীক্ষায় সফলতার হার বাড়াতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করেছিল। যদিও শিক্ষা উন্নয়নের পুরো অংশ সমাজ, পরিবার ও অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে, তার তত্ত্বাবধানে স্তরভিত্তিক নীতিগুলো নারীদের শিক্ষা খাতে মূখ্য ভূমিকা রেখেছে এবং পরে বাংলাদেশের নারী শিক্ষার চিত্র বদলে দিতে সহায়তা করেছে।

নারী জাগরণের আলোকবর্তিকা হিসাবে খালেদা জিয়ার অবদান বাংলাদেশের নারীরা চুরদিন স্মরণ রাখবে।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের পথে এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি নারীদের মাধ্যমিক শিক্ষা সহজলভ্য করতে স্টাইপেন্ড প্রকল্প ও মেয়েদের জন্য শিক্ষা বিশেষ সুবিধা চালুর মাধ্যমে নারীর প্রাপ্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর সরকারের সঠিক শিক্ষা নীতিগুলি নারীদের স্কুলে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে সমাজে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সহায়তা করে। এই নীতিগুলো সমাজের নারীদের জন্য শিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছে এবং নারীর আত্মবিশ্বাস ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে, ফলে তিনি নারীর জাগরণের এক আলোচিত নাম।

বেগম খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষায় অবদান ছিল রাষ্ট্রীয় নীতিতে নারীর স্থান নিশ্চিত করার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। তাঁর সময় গৃহীত প্রণোদনামূলক কর্মসূচি ও শিক্ষা সংস্কার নারীদের শিক্ষায় প্রবেশ সহজ করেছে এবং সামাজিক মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশের নারী জাগরণে তিনি নিঃসন্দেহে এক আলোকবর্তিকা।