বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ, শঙ্কায় সরকারের অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ উইংয়ের মাঠপর্যায়ের বিপুলসংখ্যক উপসহকারী প্রকৌশলীকে একযোগে বদলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির ভেতরে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিএডিসির ইতিহাসে এমন ব্যাপক গণবদলির নজির নেই। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কারিগরি উইংয়ের সদস্য পরিচালক (সেচ) ও প্রধান প্রকৌশলীকে কার্যত অন্ধকারে রেখে এবং প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সংস্খাটির চেয়ারম্যান জনাব মো: আজিজুল ইসলাম এর নির্দেশনায় এই বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। বিষয়টি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি বঞ্চনা, সম্প্রতি উচ্চতর পদের চলতি দায়িত্ব প্রদান করে তা আকস্মিকভাবে বাতিল এবং এরপর একযোগে গণবদলির সিদ্ধান্ত, এসব ঘটনাকে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগী প্রকৌশলীরা। তাদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সেচ উইংয়ের সদস্য পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলী—যাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশল কার্যক্রম পরিচালিত হয়—তাদের আগাম অবহিত না করেই বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। আদেশ জারির পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট উইংয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষা করে এত বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেবল প্রশাসনিক শিষ্টাচারবহির্ভূতই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের শীর্ষ পেশাজীবী সংগঠন আইডিইবি। সংগঠনটির নেতারা্ বলেন, বিএডিসির সেচ উইংয়ের মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রশাসনিক নীতিমালার পরিপন্থী। সংশ্লিষ্ট উইংয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অন্ধকারে রেখে এ ধরনের গণবদলি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংগঠনটি অবিলম্বে এই বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
গণবদলিকে ঘিরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, পারিবারিক, চিকিৎসাজনিত ও অন্যান্য যৌক্তিক কারণে দীর্ঘদিন ধরে বদলির আবেদন করেও তারা কাঙ্ক্ষিত বদলি পাননি। তাদের দাবি, আর্থিক সুবিধা দিতে রাজি না হওয়ায় বছরের পর বছর তাদের আবেদন উপেক্ষিত হয়েছে, অথচ যাদের বদলীর কোন প্রয়োজন নাই, আর্থিক বানিজ্যের উদ্দেশ্যে তাদেরকে বদলী করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে বদলির ভয় দেখিয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন। তাদের প্রশ্ন, যদি এটি কেবল প্রশাসনিক প্রয়োজনে হয়ে থাকে, তাহলে কেন সংশ্লিষ্ট সদস্য পরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হলো? কেন স্বাভাবিক ধাপে ধাপে বদলির পরিবর্তে একযোগে ব্যাপক গণবদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে একযোগে বদলির পেছনের প্রকৃত কারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের যৌক্তিকতা কি? এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না থাকায় নানা গুঞ্জন ও সন্দেহ আরও জোরালো হচ্ছে। বিধায় পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জনসম্মুখে আনা উচিত বলে ভূক্তভোগিরা মনে করছেন।
মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে।
এরই মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকে উচ্চতর পদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই দায়িত্বও বাতিল করা হয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, পদোন্নতি না দিয়ে চলতি দায়িত্ব প্রদান এবং পরে তা প্রত্যাহার করা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। এর পরপরই গণবদলির সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গণবদলির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সরকারের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত অগ্রাধিকার উন্নয়ন কর্মসূচি গুলোতে।সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে খাল পুনঃখনন, জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, সেচ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের উপসহকারী প্রকৌশলীরাই মূল চালিকাশক্তি।
একযোগে বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে নতুন কর্মস্থলে পাঠানো হলে চলমান খাল পুনঃখনন, ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের প্রকল্প, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা, বৃক্ষরোপণ এবং অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন কর্মস্থলের ভৌগোলিক ও প্রকল্পভিত্তিক বাস্তবতা বুঝে দায়িত্ব নিতে সময় লাগায় মাঠপর্যায়ে সাময়িক স্থবিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বোরো, আমন ও অন্যান্য মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আকস্মিক বদলির কারণে সেচ যন্ত্র পরিচালনা, প্রকল্প তদারকি, কৃষকদের কারিগরি সহায়তা এবং জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর সরাসরি প্রভাব কৃষি উৎপাদন, কৃষকদের সেবা এবং সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি:ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের দাবি, অবিলম্বে এই গণবদলির আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট নিরসন, চলতি দায়িত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।






