রাসেল আহমদ: বাংলাদেশকে ঘিরে বঙ্গোপসাগরীয় ভূ-রাজনীতি ক্রমশ একটি জটিল কৌশলগত বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত বাংলাদেশ নামের ছোট্ট রাষ্ট্রটি আজ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক রাজনীতির সংযোগবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি পরাশক্তির দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। প্রশ্ন হলো—এই আগ্রহ কি বাংলাদেশের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য; নাকি বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশমাত্র?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল ঘিরে যে পরিবর্তনগুলো দেখা যাচ্ছে, তা নিছক অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক নয়; বরং বৃহত্তর সামরিক ও ভূ-কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রেসিপ্রোকাল বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা, জ্বালানি খাতে সমঝোতা স্মারক, নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল,আকসা ও জিসোমিয়া-ধাঁচের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কাঠামোর সম্ভাবনা এবং মিয়ানমার সীমান্ত ঘিরে আরসা ও আরাকান-সংকট- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এমন এক ভূ-রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে প্রবেশ করছে, যার শেষ কোথায় তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে হয় না; যুদ্ধ হয় বন্দর, করিডোর, জ্বালানি, তথ্য, সাইবার অবকাঠামো এবং সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীনের উত্থান এখন প্রধান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। আর সেই কারণেই বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর, মালাক্কা প্রণালী ও মিয়ানমারের পশ্চিম উপকূল আজ কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ।
মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলের কিয়াউকপিউ বন্দর এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর। এই করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সমুদ্রপথ তৈরি করা সম্ভব হয়। কিয়াউকপিউ তাই শুধু একটি বন্দর নয়; এটি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক প্রবাহ এবং ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকারের প্রতীক।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও তাদের মিত্রদের উদ্বেগও স্বাভাবিক। কারণ চীন যদি বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে, তবে পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে। ভারত বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ তার পূর্বাঞ্চলীয় নৌ-কৌশল, আন্দামান-নিকোবর কমান্ড এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা এই পরিবর্তনের দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশ এই সংঘাতের সরাসরি পক্ষ না হলেও ভৌগোলিক কারণে এর কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন শুধু সীমান্ত অঞ্চল নয়; এগুলো ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সম্ভাব্য সংযোগবিন্দু। ফলে বাংলাদেশকে ঘিরে বিদেশি আগ্রহ বেড়েছে বহুগুণ।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জ্বালানি সহযোগিতা এবং রেসিপ্রোকাল বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে আলোচনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের আড়ালে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের নীতি অনুসরণ করে এসেছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিংবা ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়—অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং গোয়েন্দা সহযোগিতা প্রায়ই একই কৌশলগত প্যাকেজের অংশ হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে বহুদিন ধরে আলোচিত মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘আকসা’ এবং ‘জিসোমিয়া’ নতুন করে সামনে এসেছে।
আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে সামরিক সহযোগিতা, লজিস্টিকস সুবিধা কিংবা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের কারিগরি চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা বলছে, এ ধরনের চুক্তি কখনোই কেবল প্রশাসনিক বা সামরিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এগুলো ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রকে বৃহৎ শক্তির নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করায়।
অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট (আকসা) মূলত সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে জ্বালানি, রসদ, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহযোগিতার আইনি কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে এর কৌশলগত অর্থ আরও গভীর। এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্রের বন্দর, বিমানঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো ধীরে ধীরে বৃহৎ শক্তির লজিস্টিক নেটওয়ার্কের অংশে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সামরিক কৌশলের ভাষায় একে বলা হয় “লিলি প্যাড স্ট্র্যাটেজি”-অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ছাড়াই কোনো অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করা।
অন্যদিকে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিসোমিয়া) আরও স্পর্শকাতর। কারণ এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে গোপন সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের কাঠামো গড়ে ওঠে। সামরিক যোগাযোগ, রাডার তথ্য, সমুদ্র নিরাপত্তা, সাইবার অবকাঠামো কিংবা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা- সবকিছুই ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ শক্তির কৌশলগত নজরদারির আওতায় চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় তথ্য বিনিময় কখনো সমান ক্ষমতার ভিত্তিতে হয় না। যে রাষ্ট্র প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় এগিয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রই সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো কাঠামোয় প্রবেশ করে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে কৌশলগত নিরপেক্ষতার ওপর। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ যে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিকে সামনে রেখেছে, সেটি তখন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। কারণ নিরাপত্তা জোট কখনোই একমুখী হয় না; এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় সামরিক ক্রয়নীতি, প্রযুক্তিনির্ভরতা, গোয়েন্দা সমন্বয়, যৌথ মহড়া এবং আঞ্চলিক অবস্থান গ্রহণের বাধ্যবাধকতা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার ‘ফ্রন্টলাইন স্টেট’-এ পরিণত হচ্ছে?
যদি তাই হয়, তবে এর পরিণতি হতে পারে বহুমাত্রিক। প্রথমত, বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপের মুখে পড়বে। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠবে। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও জটিল হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা প্রায়ই স্থানীয় রাজনৈতিক বিভাজনকে উসকে দেয়।
মিয়ানমার সংকট এই জায়গাটিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। রাখাইনে সংঘাত যত বাড়ছে, ততই রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে। একদিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা, অন্যদিকে আরাকান আর্মি; এর মাঝখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী—এই ত্রিমুখী বাস্তবতায় বাংলাদেশের সীমান্ত ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে।
আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি বা আরসা নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট, দারিদ্র্য, হতাশা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ভবিষ্যতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর নিয়োগক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। যদিও প্রতিটি রোহিঙ্গাকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা অন্যায় ও বিপজ্জনক, তবু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। যদি রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে। অতীতে আফগানিস্তান, সিরিয়া কিংবা লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—একবার কোনো অঞ্চলে বহুজাতিক প্রক্সি যুদ্ধ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় ক্ষোভ, ধর্মীয় পরিচয়, জাতিগত প্রশ্ন এবং বিদেশি অর্থায়ন মিলে তখন যুদ্ধের নতুন অর্থনীতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো অর্থনৈতিক নির্ভরতার রাজনীতি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ একদিকে চীনা বিনিয়োগ নিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বাজারের ওপরও নির্ভরশীল থেকেছে। এই দ্বৈত ভারসাম্য এখন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটন চাইবে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিক; অন্যদিকে চীন চাইবে তার বন্দর, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত স্বার্থ সুরক্ষিত থাকুক। ভারতও চায় না বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনোভাবেই তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠুক।
এই ত্রিমুখী চাপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রকৌশল কী?
রাষ্ট্র যদি কেবল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা, ঋণ, জ্বালানি চুক্তি কিংবা রাজনৈতিক সমর্থনের হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ ভূ-রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই; আছে কেবল স্বার্থ। আজ যে শক্তি বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বের কথা বলছে, কাল প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সেই শক্তিই চাপ প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না।
ইতিহাস বলছে, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা। ফিনল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর কিংবা তুরস্ক বিভিন্ন সময়ে এই নীতি অনুসরণ করেছে। তারা কখনোই নিজেদের পুরোপুরি একক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ করেনি। বরং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যকার ভারসাম্যকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধায় ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশেরও সেই পথেই হাঁটা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন পররাষ্ট্রনীতিকেও দলীয় দৃষ্টিকোণে নিয়ে যাচ্ছে। এক পক্ষ চীনঘেঁষা, আরেক পক্ষ পশ্চিমাপন্থী—এভাবে রাষ্ট্রকৌশল পরিচালিত হলে তা বিপজ্জনক। কারণ পররাষ্ট্রনীতি কখনোই দলীয় আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; এটি পরিচালিত হয় দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ দিয়ে।
জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক তাই কেবল অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; এটি বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হতে পারে। বিশ্ব এখন জ্বালানিকে শুধু অর্থনীতির বিষয় হিসেবে দেখে না; এটি নিরাপত্তা ও সামরিক প্রভাবের অংশ। যে দেশ জ্বালানি অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক প্রভাবও বিস্তার করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রথমত, তাকে নির্ধারণ করতে হবে—সে কি সত্যিই ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সক্রিয় অংশ হতে চায়, নাকি ভারসাম্যপূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক নয়, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা যে কোনো সময় বহিরাগত শক্তির প্রক্সি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী না হলে বিদেশি শক্তির প্রভাব বাড়তেই থাকবে। দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বিভক্ত সমাজ এবং অর্থনৈতিক চাপ—এই তিনটি উপাদান কোনো রাষ্ট্রকে দ্রুত ভূ-রাজনৈতিক খেলায় পুতুলে পরিণত করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, বাংলাদেশ হয়তো ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থার দিকে যাচ্ছে যেখানে তার ভূখণ্ড সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র না হলেও বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ‘অপারেশনাল জোন’-এ পরিণত হবে। তখন বন্দর, সমুদ্রপথ, রাডার ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সীমান্ত অঞ্চল সবকিছুই আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাবের অংশ হয়ে উঠবে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাকেন্দ্রীক রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা বিদেশি শক্তির আশ্বাস—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার বিকল্প নয়। বাংলাদেশের সামনে এখন যে বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু কূটনৈতিক নয়; এটি অস্তিত্বগত।
কারণ ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—যখন পরাশক্তিরা সমুদ্রপথ, করিডোর ও কৌশলগত অঞ্চল নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামে, তখন ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসে। আর সেই মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু সরকার নয়, পুরো জাতিকেই বহন করতে হয়।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।







