সুব্রত ঘোষ, বগুড়াঃ বগুড়ায় অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে তিনশ বছরের পুরনো কাশি রায়ের জমিদার বাড়ী। এখন শুধু অতীত ঐতিহ্যের ইতিহাসের পাতায় এখন কালের স্বাক্ষী হয়ে দিনের পর দিন দাড়িয়ে আছে প্রাচীন এই জমিদার বাড়ী।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে ফুলবাড়ী ইউনিয়নের হরিণা গ্রামে তৎকালীন আমলে বসবাস করতো এক অত্যাচারী জমিদার। সেই জমিদারের নাম ছিল কাশি প্রসাদ রায়। আর এই হরিনা গ্রামেই রয়েছে তিন শত বছরের পুরোনো কাশি রায়ের বাড়ী। অযত্ন আর অবহেলায় ধীরে ধীরে এই অত্যাচারী কাশি রায়ের জমিদারবাড়ী আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে কাশি প্রসাদ রায়ের জমিদারবাড়ি হিসেবে চেনেন। এক সময় বাড়িটি ছিল প্রাচীরঘেরা। চারপাশে ছিল বিশাল আকৃতির চারটি লোহার দরজা। বাড়ির ভেতরের দক্ষিণাংশে ছিল একটি প্রাচীন দুর্গামন্দির। এর দেয়ালে ছিল নানা ধরনের কারুকাজ। দুর্গামন্দির হলেও সেখানে সব ধরনের পূজারই আয়োজন হতো। এই মন্দিরে সে সময় সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হতো বলে জানান স্থানীয় লোকজন। সে উপলক্ষে পাশের হরিণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বসত শ্রী পঞ্চমীর মেলা। জমিদাররা না থাকলেও এখনো প্রতিবছর তাদের প্রচলিত শ্রী পঞ্চমীর মেলা বসে ওই গ্রামে। সরেজমিনে
জানা যায়, জমিদার কাশি প্রসাদ রায়ের জমি ছিল প্রায় আড়াই হাজার বিঘা। এরপর উত্তরাধিকার সূত্রে এ অঞ্চলে জমিদারি করেন তারই দুই ছেলে এবং দুই ভাতিজা। তারা হলেন উপন্দ্রে লাল রায় ও রাজেন্দ্র লাল রায় এবং যোগেন রায় ও দেবেন রায়। তবে এ অঞ্চলের মূল জোতের মালিক ছিলেন নাটোরের জমিদার রাজা যোগেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর। ভারত বিভক্তির আগে খাজনা বাকি পড়ায় নিলামের মাধ্যমে কাশি রায়ের কাছ থেকে জমিদারি প্রত্যাহার করে নেন নাটোরের জমিদার রাজা যোগেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর। এরপর দেশ বিবাের পর কাশি রায়ের বাড়ীর লোকজন ঘর বাড়ী ফেলে রেখে ভারতে চলে যান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত বাড়িটিতে কেউ থাকতেন না বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এই বাড়ী থেকে উত্তর ও পূর্ব এলাকায় মুক্তি যুদ্ধের কার্যক্রম চালাতো মুক্তিযোদ্ধারা।
হরিণা গ্রামে এককালের প্রতাপশালী জমিদার কাশি প্রসাদ রায়ের জমিদার বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তিনশ বছরের প্রাচীন এই জমিদার বাড়ীটি চুন সুড়কির তৈরি। সুরক্ষিতভাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাশে একটি শয়নকক্ষ ছিল। প্রাসাদের উত্তর পাশ ছিল নাচঘর, জেলখানা আর দক্ষিণে ছিল কাচারিঘর, ভোগঘর ও মন্দির। মন্দিরের উঠোনে ছিল ইন্দারা। খরা মৌসুমে ওই ইন্দারার তলদেশের দেখা পাওয়া যেত না। এই জমিদার বাড়ির মূল প্রবেশ পথে রয়েছে লোহার পাতের তৈরি অত্যাধুনিক দরজা। বাড়ির জানালা খিলান সবই মজবুত লোহার পাতের তৈরি । বর্তমানে দরজা-জানালাগুলো অযত্ন আর অবহেলায় অবস্থায় পড়ে আছে। উক্ত হিন্দু জমিদার কাশি প্রসাদ রায় ও তার জমিদার বাড়িটি ঘিরে এখনো মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে বহু কাহিনী ও প্রজাদের অত্যাচারের নির্মম ঘটনা। জমিদার কৃষ্ট প্রসাদ রায় পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত জমিদারি চালাতে জমিদার কাশি প্রসাদ রায় নানা অজুহাতে প্রজাদের ওপর অন্যায় অত্যাচার করত। জমিদার কাশি রায় ছিলেন খুবই নারীলোভী। তার নজরে একবার কোনো সুন্দরী নারীর ওপর চোখ পড়লে সে আর রেহাই পেত না তার কবল থেকে। নারীলোভী কাশি রায়ের জমিদারি এলাকায় কোনো নারীকে বিবাহ দিতে হলে তার কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হত। তার অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহ হলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হত প্রজাদের ।
এমনি অত্যাচারের নির্মম বর্ননা দিতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের চোখে জল এসেছে। প্রতাপশালী জমিদার কাশি প্রসাদ রায় ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তার সহায়সম্পত্তি কমতে থাকে। সেই সঙ্গে তার প্রতাপও দিন দিন কমে আসে। জনশ্রুতি আছে ওই জমিদার শেষ জীবনের এক পর্যায়ে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে জীবনযাপন করে মৃত্যুবরণ করেছে বলর স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। তার মৃত্যুর পর দু’পুত্র কুপেন্দ নাথ রায় ও রাজেন্দ নাথ রায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তাদের পিতার জমিদার বাড়িটি উপজেলার মাজবাড়ি গ্রামের দবিরুদ্দীন প্রাং-এর কাছে বিক্রি করে ভারতে চলে যায় বলে জানা গেছে।
বর্তমানে বাড়িটিতে দবিরুদ্দীন প্রাং-এর উত্তরসূরি ওয়ারিশরা বসবাস করছেন। বাড়িটি বর্তমানে বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিক এ জমিদার বাড়িটিকে ঘিরে এখনো নানা ঘটনা ও স্মৃতি মানুষের মুখে মুখে বয়ে বেড়াচ্ছে। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবী সরকারি ভাবে এই কাশি রায়ের জমিদার বাড়ী সংরক্ষণ করা হোক। তাহলে অতীত ঐতিহ্য এবং অত্যাচরী জমিদার কাশি প্রসাদ রায়ের প্রজাদের প্রতি অত্যাচারের ইতিহাস আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে।







