এক যুগের ২৫০ ট্রাক বর্জ্য সরিয়ে ব্যবসায়ীদের ফুল ও সম্মাননা দিল জেলা প্রশাসন
চট্টগ্রাম ব্যুরো: সরকারি কর্মকর্তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানানোর দৃশ্য বাংলাদেশে বেশ পরিচিত। কিন্তু চট্টগ্রামে ঘটল এর উল্টোটা। ফুল নিতে নয়, ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে ফুল হাতে নাগরিকদের কাছে গেলেন জেলা প্রশাসক।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) সভাপতি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা হাজির হন কাজীর দেউড়িতে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসংলগ্ন সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সে। সঙ্গে ছিল ফুল ও সম্মাননা স্মারক। এগুলো তিনি তুলে দেন শপিং কমপ্লেক্সের দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের হাতে।
কারণ, প্রায় এক যুগ ধরে জমে থাকা ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য নিজেদের উদ্যোগে সরিয়ে ফেলেছেন তাঁরা।
জেলা প্রশাসকের ভাষায়, ‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, ফুলও দেয়।’
শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য একসময় বড় স্তূপে পরিণত হয়েছিল। এতে দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছিল। তৈরি হয়েছিল মশার প্রজনন ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, সেখানে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য জমেছিল। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব বর্জ্য ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে সেখানে পড়ে ছিল।
জেলা প্রশাসক বলেন, বর্জ্যের মধ্যে দাহ্য পদার্থ থাকায় সেখানে আগুন লাগলে পাশের মার্কেট ও এম এ আজিজ স্টেডিয়ামও ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
কয়েক দিনের উদ্যোগে এক যুগের জঞ্জাল
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বর্তমানে ‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগানে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদে একযোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত সীতাকুণ্ডে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির পর কর্ণফুলীতেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় নজরে আসে সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সের দীর্ঘদিনের বর্জ্যের স্তূপ।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সিজেকেএসের অ্যাডহক কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতি নিজেদের উদ্যোগে বর্জ্য অপসারণ শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয় বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বর্জ্য।
দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জায়গাটি পরিষ্কার করার পরিকল্পনা ছিল। জেলা প্রশাসনের উৎসাহ ও সহযোগিতা পাওয়ার পর তাঁরা কাজ শুরু করেন।
তবে কাজের স্বীকৃতি দিতে জেলা প্রশাসক নিজেই ফুল নিয়ে আসবেন, তা ভাবেননি তিনি।
কামাল হোসেন বলেন, ‘ডিসি মহোদয় নিজে এসে আমাদের ধন্যবাদ জানাবেন, ফুল দিয়ে উৎসাহিত করবেন—এটা ভাবিনি। তাঁর এই স্বীকৃতি আমাদের উৎসাহিত করেছে।’
সমিতির সভাপতি মুকলেসুর রহমান বলেন, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তাঁরা কাজটি করেননি। মানুষের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতি তাঁদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
সিজেকেএসের সদস্যসচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিনও ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘সাধারণত কোনো কর্মকর্তা এলে তাঁকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এখানে ডিসি সাহেব নিজেই এসে যাঁরা কাজটি করেছেন, তাঁদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমন ঘটনা আমি আগে দেখিনি।’
‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, ফুল দেয়’
ব্যবসায়ীদের ফুল ও সম্মাননা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে একটি শহরকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করা সম্ভব নয়। এ জন্য নাগরিকদের মধ্যেও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, জেলা প্রশাসন ফুল দেয়। আমরা তাঁদের হাতে আজ ফুল দিয়েছি। ভালো কাজের জন্য স্মারক উপহার দিয়েছি।’
শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য অপসারণ সহজ কাজ ছিল না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘হয়তো এই ফুল সামান্য। কিন্তু তাঁদের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, যে সম্মান—সেটা অনেক বড়। সেই সম্মান দেখাতেই আজ তাঁদের কাছে এসেছি।’
নিজের সরকারি চাকরিজীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে এ কাজটি মনে থাকবে বলেও জানান তিনি।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, চাকরিজীবনের কিছু কাজ স্মৃতিকোঠায় থেকে যায়। সুন্দর একটি স্টেডিয়াম ও মার্কেটের পাশে ১২ বছর ধরে জমে থাকা ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক ময়লার স্তূপ অপসারণ—আমার মনে হয়, এই কাজটি আমার স্মৃতিতে থেকে যাবে।’
এবার বর্জ্যের জায়গায় বাগান
বর্জ্য অপসারণের মধ্য দিয়েই উদ্যোগটি শেষ হচ্ছে না। এত দিন যে জায়গাটি ময়লার স্তূপে ঢাকা ছিল, সেটিকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক জানান, সেখানে বাগান করা হবে। থাকবে বসার জায়গা ও পানির ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এলাকাটিকে সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায় আনা হবে।
ভবিষ্যতে যাতে সেখানে আবার ময়লা জমতে না পারে, সে জন্য সিসিটিভি ক্যামেরাও স্থাপন করা হবে। কেউ অবৈধভাবে সেখানে ময়লা ফেললে ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো ছাড় আমি দেব না।’
প্রায় এক যুগ ধরে যে জায়গায় জমেছিল আবর্জনার পাহাড়, কয়েক দিনের উদ্যোগে এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে পরিচ্ছন্ন পরিবেশের সম্ভাবনা। সামনে সেই জায়গায় গড়ে উঠবে বাগান, বসার স্থান ও সৌন্দর্যবর্ধিত পরিসর।
আর এই পুরো উদ্যোগে সবচেয়ে প্রতীকী হয়ে থাকল একটি দৃশ্য—যে প্রশাসন সাধারণত নাগরিকের কাছ থেকে ফুল গ্রহণ করে, সেই প্রশাসনই এবার ফুল নিয়ে নাগরিকের দ্বারে গেল, ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে।






