, ,

প্রসঙ্গ : সাহাবুদ্দীনের পদত্যাগ

নিউজটি শেয়ার করুন

পদত্যাগের পটভূমি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা

২০২৬ সালের ২৪ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টা। জাতীয় সংসদ ভবনের স্পিকারের একান্ত সচিবের টেবিলে একটি সাদা খাম জমা পড়ে। খামের ওপরে লেখা “মাননীয় স্পিকার বরাবর, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র”। খাম খুলতেই বেরিয়ে আসে এক পৃষ্ঠার চিঠি। স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। চিঠির ভাষা ছোট, কিন্তু বার্তা বড়। তিনি লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। কয়েক বছর আগে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। সম্প্রতি “Autonomic Neuropathy” ধরা পড়েছে। মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। এই শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় সংবিধান প্রদত্ত গুরুদায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে আর সম্ভব না। তাই বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছেন। চিঠির শেষ লাইনে তিনি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

এই এক পৃষ্ঠার কাগজ জমা পড়ার সাথে সাথেই বঙ্গভবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন, গণমাধ্যম, সাধারণ মানুষ সবার মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। কারণ পদত্যাগটি সময়ের দিক থেকে খুবই অপ্রত্যাশিত। মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। সেদিন তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ৫ বছর। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। অর্থাৎ হাতে আরও ২১ মাস বাকি থাকতেই তিনি সরে দাঁড়ালেন। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে যাঁর অবস্থান প্রথম, সেই ব্যক্তির মাঝপথে সরে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে। সেদিন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। এরপর দেশে গঠিত হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার পতনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে দাবি ওঠে, আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকেও পদত্যাগ করতে হবে। যুক্তি ছিল, যিনি একটি বিতর্কিত সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, তিনি নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্র চালাতে পারবেন না। বঙ্গভবন ঘেরাও, মিছিল, মানবন্ধন সবই হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে। তারা বলে, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক পদ। তাকে সরাতে হলে সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়া লাগবে। হুট করে অপসারণ করলে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে। তাই তারা রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখে।

ওই সময় রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে তাকে নানাভাবে কোণঠাসা করা হয়েছে। তার দাবি ছিল, তাকে বিদেশ সফরে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। বঙ্গভবনের প্রেস উইং প্রায় অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি ঈদের জামাতেও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নষ্ট করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এই বক্তব্য তখন বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকে বলেছেন রাষ্ট্রপতি ঠিকই বলেছেন। আবার অনেকে বলেছেন, পরিস্থিতির কারণে এসব করা ছাড়া উপায় ছিল না।

এরপর ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। নতুন সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রপতির সাথে সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ এবং ঈদের দিন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে একসাথে দেখা যায়। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন যাওয়ার অনুমতি পান। তখন মনে হচ্ছিল সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে। কিন্তু লন্ডন থেকে ফেরার পরই পরিস্থিতি আবার বদলাতে থাকে। রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন শুরু হয়, সরকার রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে অস্বস্তিতে আছে।

এই অস্বস্তির কারণ কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কয়েকটি বিষয় সামনে আনেন। প্রথমত, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ। তৃতীয়ত, আগামী ৩০ জুলাই ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর। এই সফরে তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের যৌক্তিকতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব নিয়ে কথা বলবেন। সরকার চাইছিল গোর আসার আগেই রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তন আনতে। যাতে কূটনৈতিকভাবে একটি বার্তা দেওয়া যায়।

এর মাঝে একটি ইংরেজি দৈনিক খবর প্রকাশ করে যে, লন্ডনে থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এই খবর প্রকাশের পর সরকারের ভেতরে রাষ্ট্রপতি নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। যদিও রাষ্ট্রপতি এই অভিযোগকে “কল্পনার অতীত” বলে উড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে অন্যান্য সূত্রও এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু রাজনীতিতে সন্দেহ একবার ঢুকলে তা সহজে যায় না।

এই প্রেক্ষাপটেই আসে পদত্যাগপত্র। এখন প্রশ্ন হলো, এটা কি নিছক স্বাস্থ্যগত কারণ? নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার ফসল? সংবিধানের আলোকে দেখলে পদত্যাগের প্রক্রিয়া একদম ঠিক আছে। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারবেন। ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ১২৩ অনুচ্ছেদের ২ উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, পদ শূন্য হওয়ার তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।

পদত্যাগপত্র জমা পড়ার পরপরই স্পিকার মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ থাইল্যান্ডে চিকিৎসা সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরেন। ৯০ দিনের মধ্যে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা তৃতীয়বারের মতো ঘটল যে একজন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পদত্যাগ করলেন। এর আগে ১৯৭৫ সালে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ২০০২ সালে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ইমপিচমেন্টের ভয় দেখিয়ে পদত্যাগ করানো হয়। এবার তৃতীয়বার মোঃ সাহাবুদ্দিন। তবে এবারের প্রেক্ষাপট আগের দুইবারের চেয়ে ভিন্ন। এবার সরাসরি কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ নেই, ইমপিচমেন্টও নেই। আছে রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং স্বাস্থ্যগত অজুহাত।

সাংবিধানিক আইনজীবীদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আইনি কোনো ফাঁক নেই। তিনি নিজে পদত্যাগ করেছেন। স্পিকার দায়িত্ব নিয়েছেন। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সবকিছু সংবিধানসম্মত। কিন্তু নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়। একজন রাষ্ট্রপতি কি শুধু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার কাছে মাথা নত করবেন? নাকি তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ৫ বছর পূর্ণ করার দায়িত্ব রাখেন? আবার উল্টো প্রশ্নও আছে। যে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে জনগণের একাংশের আস্থা নেই, তাকে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে রাখা কি গণতন্ত্রের জন্য ভালো? এই দুই প্রশ্নের মাঝেই আটকে আছে বর্তমান বিতর্ক।

এছাড়া রাষ্ট্রপতির পদটি আমাদের সংবিধানে কেমন, সেটাও বোঝা দরকার। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ছিলেন নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতি মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। শুধু কয়েকটি ক্ষেত্রে তার বিবেচনামূলক ক্ষমতা আছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া, অধ্যাদেশ জারি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রেও তিনি সরকারের পরামর্শই মানেন। তাহলে প্রশ্ন আসে, এত ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে এত টানাপোড়েন কেন? উত্তর হলো, প্রতীকী গুরুত্ব। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রতীক। জাতির ঐক্যের প্রতীক। সংকটের সময় জাতির দিকে তাকিয়ে থাকার জায়গা।

মোঃ সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে যখন দেশ উত্তাল, তখন তার ভূমিকা নিয়ে দুই রকম মূল্যায়ন হয়েছে। সরকারপন্থীরা বলেছেন, তিনি স্থিতিশীলতা রক্ষা করেছেন। বিরোধীরা বলেছেন, তিনি নীরব থেকেছেন। এই বিতর্কের মীমাংসা হয়নি। পদত্যাগের মাধ্যমে বরং নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

এখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া চলবে। স্পিকার ৯০ দিন দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। যেহেতু সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, তাই তাদের মনোনীত প্রার্থীই জিতবেন এটা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রপতি কেমন হবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তিনি কি শুধু দলীয় রাষ্ট্রপতি হবেন, নাকি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হবেন?

রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জঃ

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র জমা পড়ার পর রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হলো “সময়টা কেন এখনই?” মেয়াদের আরও ২১ মাস বাকি। শরীর খারাপ হলে আগেওতো হতে পারত। সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগও নেই। তাহলে হঠাৎ পদত্যাগ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাতে হবে।

আগামী ৩০ জুলাই থেকে তিন দিনের জন্য বাংলাদেশে আসছেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর। তিনি একাধারে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দূত। তার এই সফরের এজেন্ডা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কথা আছে। জানা যাচ্ছে, তিনি সরকারের সাথে তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। এক. আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখার যৌক্তিকতা। দুই. মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিনা বিচারে আটক ও আইনের শাসন। তিন. এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব এবং বাংলাদেশের চীনমুখী নীতি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এখন এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব ঠেকাতে একসাথে কাজ করছে। একই সাথে তারা চায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত হোক। আর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়েও তাদের অবস্থান আছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা মার্কিন বিশেষ দূতের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে নতুন নির্বাচন দেওয়া হোক। এই প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মতামত জানতে চেয়েছে। এখান থেকেই সরকারের ভেতরে সন্দেহের শুরু। বিএনপি মনে করছে, শেখ হাসিনার এই প্রস্তাবের সাথে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা। যদিও এর পক্ষে কোনো সরাসরি প্রমাণ নেই। কিন্তু রাজনীতিতে সন্দেহই যথেষ্ট।

এই কারণেই সরকার দ্রুত রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তন আনতে চেয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যাতে গোর যখন আসবেন, তখন বাংলাদেশে একজন নতুন রাষ্ট্রপতি থাকেন। যিনি সরকারের নীতির সাথে পুরোপুরি একমত। এটাকে অনেকে বলছেন কূটনৈতিক কৌশল। আবার অনেকে বলছেন, এটা রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয়করণ।

এর মাঝে আরেকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। একটি ইংরেজি দৈনিক দাবি করেছে, লন্ডনে চিকিৎসার সময় রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনার সাথে ফোনে কথা বলেছেন। যদিও রাষ্ট্রপতি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন এটা ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পরবর্তীতে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রও এই তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু খবরটি প্রকাশের পর সরকারের ভেতরে রাষ্ট্রপতি নিয়ে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।

এখন সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। যেহেতু জাতীয় সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, তাই তাদের মনোনীত প্রার্থীই জিতবেন এটা নিশ্চিত। কিন্তু এখানেই আসে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন রাষ্ট্রপতি কি শুধু দলীয় পরিচয়ে চিহ্নিত হবেন? নাকি তিনি জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারবেন?

২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, তা ঘোচানোর দায়িত্ব এখন নতুন রাষ্ট্রপতির কাঁধে। তাকে সব রাজনৈতিক দল, সব মতের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। তাকে সংবিধানের রক্ষক হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে হবে, কিন্তু একই সাথে বিবেকের কাছেও দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রপতির কাজ অনেকটা আনুষ্ঠানিক মনে হয়। ফিতা কাটা, বিদেশি অতিথি অভ্যর্থনা, পুরস্কার দেওয়া। কিন্তু সংকটের সময় এই পদের গুরুত্ব বোঝা যায়। যখন সংসদ অচল হয়, যখন সরকার ও বিরোধীর মধ্যে সংলাপ বন্ধ হয়, যখন জাতি দিশেহারা হয়, তখন জাতি তাকায় বঙ্গভবনের দিকে। রাষ্ট্রপতির একটি ভাষণ, একটি সিদ্ধান্ত পুরো জাতির দিক ঠিক করে দিতে পারে।

মোঃ সাহাবুদ্দিনের সময়ে সেই পরীক্ষা এসেছিল ২০২৪ এর জুলাইতে। তখন তার ভূমিকা নিয়ে আজও দুই রকম মূল্যায়ন। কেউ বলেন তিনি সংযম দেখিয়েছেন। কেউ বলেন তিনি দায়িত্ব এড়িয়েছেন। পদত্যাগের মাধ্যমে সেই বিতর্কেরও ইতি হলো না।

এখন নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বড়। একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন সবার নজর বাংলাদেশের দিকে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, বিএনপি কিভাবে সরকার চালাবে, ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হবে, সবকিছু।

রাজনৈতিক দলগুলোকেও এখন ভাবতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদকে যদি আমরা বারবার দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করি, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে পড়বে। আজ বিএনপি সরকার, কাল অন্য কেউ। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যাবে। তাই রাষ্ট্রপতিকে হতে হবে সবার।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখি, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদ সবসময় বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সায়েম সাহেবকে দিয়ে পদত্যাগ করানো হয়। ২০০২ সালে বি. চৌধুরীকে ইমপিচমেন্টের ভয় দেখানো হয়। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতিকে কোণঠাসা করা হয়। আর ২০২৬ সালে এসে মেয়াদের মাঝপথে পদত্যাগ। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে আমাদের রাষ্ট্রপতির পদ এখনও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে বঙ্গভবনের রংও বদলায়।

শেষ কথা হলো, মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ আইনত বৈধ। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি বিতর্কিত। কারণ সময়, প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ সবকিছু মিলিয়ে এটাকে নিছক স্বাস্থ্যগত কারণ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।

ইতিহাস হয়তো একদিন রায় দেবে। তিনি কি নিজের ইচ্ছায় গেছেন, নাকি যেতে বাধ্য হয়েছেন। আপাতত জাতি তাকিয়ে আছে নতুন রাষ্ট্রপতির দিকে। তিনি কি শুধু সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ মেনে চলবেন, নাকি জাতির বিবেকের ডাকও শুনবেন।

সবশেষে একটি কথা। সম্মান কেউ কাউকে দেয় না। আল্লাহ যাকে সম্মান দিতে চান, পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে সেই সম্মান থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। রাজনীতির এই পালাবদল, উত্থান-পতনের মাঝেও এই চিরন্তন সত্যটাই বারবার প্রমাণ হয়। রাষ্ট্রপতি আসেন, যান। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়। আর রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা যার সাথে থাকবে, ইতিহাস তাকেই মনে রাখবে।