, ,

পাখিদের ডাকে ঘুম ভাঙে যে গ্রামের: ১৫ বছরের অভয়আশ্রম নাজিরপাড়া

নিউজটি শেয়ার করুন

১৫ বছরের অধিক সময় ধরে পাখিদের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের। যেন দেড়যুগ ধরে পাখিদের অভয়আরণ্য পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাজিরপাড়া এই গ্রামটি। সকাল শুরু হয় শত শত পাখির কিচিরমিচির শব্দে। গাছের ডালে ডালে বাসা, বাসায় মাথা উঁচু করে বসে থাকা ছানা, আর খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত মা পাখিদের উড়াউড়িতে মুখর পুরো এলাকা। প্রতি বছর বংশবিস্তারের জন্য নানা প্রজাতির দেশি ও অতিথি পাখি এই গ্রামটিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নাজিরপাড়া গ্রামের সবচেয়ে উচু গাছগুলোয় ঝুলছে অসংখ্য পাখির বাসা। শামুকখোল, বিভিন্ন প্রজাতির বক, পানকৌড়ি, রাতচরা ও ঘুঘুসহ নানা পাখির অবাধ বিচরণ চারদিকে। গাছের ডালে পাখির বাসায় কোথাও সদ্য ফোটা পাখির ছানারা মাথা তুলে বসে আছে, আবার কোথাও মা পাখি ছানার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই দর্শনার্থী ও আলোকচিত্রীরা ভিড় জমাচ্ছেন।

গ্রামের বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া সেলিম বলেন, প্রতি বছর জুন-জুলাই মাসে আমার বাড়ী সহ আশেপাশের বড়বড় গাছে এসব অতিথি পাখিরা আসে। গাছের ডালে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে এবং ছানা ফোটায়। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস অবস্থানের পর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বংশবৃদ্ধি শেষে তারা আবার নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যায়। বিগত ১৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলছে এই আসা-যাওয়া। পরিযায়ী পাখির মধ্যে শামুকখোল সবচেয়ে বেশি। বাইরের কেউ পাখি শিকার করতে এলে গ্রামের তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা মিলে তা প্রতিরোধ করেন। আমিও চেষ্টা করি আমার বাড়ীর আশেপাশে যাতে কেউ পাখি শিকার করতে না পারে। এভাবেই প্রায় ১৫ বছর ধরে চলছে।

তিনি আরও বলেন, “সকালে পাখির ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে। তবে মলমূত্রের কারণে রাস্তাঘাট নোংরা হয় ও দুর্গন্ধ ছড়ায়। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হলে অধিবাসীদের ভোগান্তি কমত।”

আরেক বাসিন্দা তমিজদার রহমান খোকা জানান, প্রতি বছরই এখানে সংবাদকর্মী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিপুলসংখ্যক পর্যটক পাখি দেখতে আসেন। গ্রামের মানুষ কঠোরভাবে পাখি শিকার প্রতিরোধ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুল আলম বলেন, “পাখির কারণেই নাজিরপাড়া আজ সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে। মলমূত্রের কারণে কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ তা মেনে নিয়েছেন। এমনকি স্থানীয়রা পাখিদের নিয়মিত খাবারও দেন।”

ঘুরতে আসা ফারুক ইসলাম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “বিকেলে নাজিরপাড়ার পরিবেশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। শত শত পাখির কলকাকলি ও ওড়াউড়ি যেকোনো মানুষকে আকর্ষিত করবে।”

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিউল ইসলাম বলেন, “নাজিরপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট সময়ে অতিথি পাখি এসে এখানে বংশবিস্তার করছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকা পরিদর্শন করে অধিবাসীদের সচেতন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও পাখি সংরক্ষণে যথেষ্ট আন্তরিক।”

ইউএনও আরও জানান, যেসব গাছে পাখিগুলো বাসা বাঁধে, সেগুলো সংরক্ষণে প্রশাসন বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। গাছ না কাটার জন্য স্থানীয়দের অনুরোধ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সচেতনতামূলক সভাও আয়োজন করা হয়েছে।