, ,

পরিচয়ের লড়াই নয়, সহাবস্থানের বাংলাদেশ আদিবাসী প্রশ্নে ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও নাগরিক অধিকারের নতুন পাঠ

নিউজটি শেয়ার করুন

“দেশে কোনো আদিবাসী নেই -এমন কথা শুনে অবাক হই না। কারণ এই বক্তব্য নতুন নয়। অতীতেও শুনেছি, এখনও শুনছি; ভবিষ্যতেও হয়তো শুনতে হবে। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় কারও স্বীকার বা অস্বীকারের ওপর নির্ভর করে না। কেউ বৃহস্পতি গ্রহ দেখেনি বলে যেমন বৃহস্পতি অস্তিত্বহীন হয়ে যায় না, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠের অস্বীকৃতিতে কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বও মুছে যায় না।”

সুহৃদ রিপন বানাইয়ের একটি ফেসবুক পোস্টের এই কথাগুলো আমাদের ভাবায়। বিশেষ করে এই কারণে যে, বাংলাদেশে পাহাড় ও সমতলে বাঙালি ও বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের যে দীর্ঘ সহাবস্থান, তা আজ যেন ক্রমেই পরিচয়ের দ্বন্দ্বে আটকে পড়ছে।

“আদিবাসী আছে কি নেই” -এই প্রশ্নটি কখনও কখনও এমনভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, যেন একটি শব্দের স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতিই সব সমস্যার সমাধান। অথচ বাস্তবতা আরও জটিল।

বাংলাদেশে “আদিবাসী” শব্দটি নিয়ে বিতর্কের একটি বড় কারণ হলো রাষ্ট্রীয় পরিভাষা ও আন্তর্জাতিক পরিভাষার পার্থক্য। বাংলাদেশের সংবিধানে “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী”, “জাতিসত্তা”, “উপজাতি” ও “সম্প্রদায়” ধরনের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে Indigenous peoples একটি স্বতন্ত্র অধিকারভিত্তিক ধারণা। ফলে রাষ্ট্রীয় কোনো একটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বলেই একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ইতিহাস কিংবা নৃবৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য শেষ হয়ে যায় -এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যুক্তিসঙ্গত নয়।

আবার এটিও ঠিক নয় যে বিশ্বের যেসব জনগোষ্ঠী নিজেদের Indigenous বলে পরিচয় দেয়, তাদের সবার ইতিহাস একই। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বহু Indigenous জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে ইউরোপীয় উপনিবেশ, ভূমি দখল, জনসংখ্যাগত বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস সেই ইতিহাসের হুবহু অনুবাদ নয়।

এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।

বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, গারো, হাজং, সাঁওতাল, খাসিয়া, মণিপুরি, ওঁরাওসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এক নয়। কারও ভাষা টিবেটো-বর্মি ভাষাপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারও ভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ধারার। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, স্থানান্তর, মিথস্ক্রিয়া ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের পথ।

একই কথা বাঙালির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাঙালি কোনো “বিশুদ্ধ” বা একক জাতিগত সত্তা নয়। দীর্ঘ ইতিহাসে নানা জনগোষ্ঠী, ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া থেকেই বাঙালি পরিচয়ের বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক মিশ্রণকে সামনে এনে আজকের স্বতন্ত্র জাতিসত্তাগুলোর পরিচয় অস্বীকার করা যায় না। একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক পরিচয়ের গঠনে কোনো জনগোষ্ঠীর অবদান থাকা এবং সেই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় থাকা -দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।

অর্থাৎ, কেউ একই সঙ্গে চাকমা এবং বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারেন; গারো এবং বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারেন; সাঁওতাল এবং বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারেন। নাগরিক পরিচয় ও জাতিগত-সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অন্যের বিকল্প নয়।

এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রের কাজ কোনো একটি জাতিগত পরিচয়কে অন্য সব পরিচয়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়। আবার প্রত্যেক জাতিসত্তাকে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক সত্তায় পরিণত করাও রাষ্ট্রের কাজ নয়। রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত নাগরিক সমতা -কিন্তু নাগরিক সমতা মানে সবাইকে একই পরিচয়ের ছাঁচে ঢেলে দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামোও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০০ সালের Chittagong Hill Tracts Regulation পাহাড়ি অঞ্চলের ভূমি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনিক বাস্তবতাকে সমতল অঞ্চলের তুলনায় ভিন্নভাবে বিবেচনা করেছিল। এই ইতিহাস অন্তত এটুকু দেখায় যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সামাজিক ও ভূমি-ব্যবস্থার বাস্তবতা নতুন কোনো আবিষ্কার নয়।
পরবর্তী ইতিহাসে কাপ্তাই বাঁধের কারণে বিপুল মানুষের বাস্তুচ্যুতি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ, সমতলের সাঁওতালদের ভূমি সংকট, গারো ও খাসিয়াদের বন ও ভূমি-অধিকার প্রশ্ন -এসব ঘটনাও দেখায় যে পরিচয়ের প্রশ্নটি কেবল ভাষা বা সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূমি, জীবিকা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও Indigenous peoples-এর অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো গড়ে উঠেছে। জাতিসংঘের Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) আত্মপরিচয়, ভূমি, সংস্কৃতি, অংশগ্রহণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে। ILO Convention No. 169-ও Indigenous and Tribal Peoples-এর অধিকার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতাকে বুঝতে এসব কাঠামোকে যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ না করে দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসকে কেবল “Ssettler বনাম Native” দ্বন্দ্বে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এই ভূখণ্ডে বাঙালি এবং বিভিন্ন জাতিসত্তার পূর্বসূরিদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সহাবস্থান, সংঘাত, বাণিজ্য, স্থানান্তর, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মিশ্রণ ঘটেছে। কোথাও এক জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছে, কোথাও অন্য জনগোষ্ঠী। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতা সরল কোনো দ্বৈত কাঠামোয় আটকে নেই।

কিন্তু এই জটিল ইতিহাসকে সামনে এনে বর্তমান অধিকার প্রশ্নকে অস্বীকার করাও সমান ভুল।

কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের যে পরিচয়ে দেখতে চায়, সেই আত্মপরিচয়কে সম্মান করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের উচিত ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর আলোকে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। “আদিবাসী” শব্দটি নিয়ে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু সেই বিতর্ক যেন মানুষের বাস্তব অধিকারকে আড়াল না করে।

দুঃখজনক হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিচয়ের প্রশ্নটি প্রায়ই যুক্তির বদলে সন্দেহ ও শত্রুতার ভাষায় হাজির হয়। কাউকে “দেশদ্রোহী”, “বিচ্ছিন্নতাবাদী” কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক তকমা দিয়ে তার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ; কিন্তু তার বক্তব্যের যুক্তি খণ্ডন করা কঠিন। একইভাবে কোনো জনগোষ্ঠীকে কেবল “আদিবাসী” পরিচয়ের কারণে বাঙালির প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়।
এই দুই ধরনের সরলীকরণই বিপজ্জনক।

একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী মনোভাব যদি বলে -“সবাই বাঙালি, আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন নেই” -তাহলে তা স্বতন্ত্র জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে সংকুচিত করে। অন্যদিকে যদি বলা হয় -“বাঙালি বনাম আদিবাসী” -তাহলে বহু শতাব্দীর সহাবস্থান, পারস্পরিক সম্পর্ক ও যৌথ ইতিহাসকে একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্বে নামিয়ে আনা হয়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য আমাদের এই দুই চরম অবস্থান থেকেই বেরিয়ে আসতে হবে।

কারণ পরিচয় কোনো শূন্য-সম খেলা নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে নিজের জাতিগত পরিচয় ধারণ করতে পারেন এবং বাংলাদেশের পূর্ণ নাগরিক হতে পারেন। তার মাতৃভাষা বাংলা নাও হতে পারে; তার সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতি থেকে আলাদা হতে পারে; তার ঐতিহাসিক ভূমিসম্পর্কও ভিন্ন হতে পারে। তবু রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিক মর্যাদা অন্য কারও চেয়ে কম হতে পারে না।

এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরও একটি দায়িত্ব আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত -এটি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব কোনো একক জাতিসত্তার একচ্ছত্র সম্পত্তি হয়ে থাকতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণও বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।

স্বাধীনতার রাষ্ট্রকে তাই এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, যেখানে স্বাধীনতার সুফল পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজিত হবে না।

একইভাবে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোরও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এমন ভাষায় পরিচালিত করা প্রয়োজন, যাতে তা বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সঙ্গে সংলাপ ও সহাবস্থানের পথকে শক্তিশালী করে। অধিকার দাবি কখনো কারও বিরুদ্ধে অস্তিত্বের দাবি হওয়া উচিত নয়।

আজকের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাই “কে আসল আদিবাসী?” -এটি নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত -এই রাষ্ট্রে কে সমান মর্যাদা পাচ্ছে, কে তার ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারছে, কে তার ঐতিহাসিক ভূমি ও জীবিকার ওপর ন্যায্য অধিকার ভোগ করছে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার কণ্ঠ কতটা শোনা যাচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মান নির্ধারণ করে।

আমরা যদি সত্যিই একটি আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ চাই, তাহলে পরিচয়ের ভিন্নতাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বাঙালি পরিচয়কে দুর্বল না করেও চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, ম্রো, ত্রিপুরা, হাজং, খাসিয়া কিংবা অন্য যেকোনো জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা সম্ভব। বরং অন্যের পরিচয়কে সম্মান করার মধ্য দিয়েই নিজের পরিচয়ের শক্তি ও পরিপক্বতা প্রকাশ পায়।

আজ যে সরকার আছে, কাল তা থাকবে না। আজ যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, ভবিষ্যতে তারাও ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে যাবে। কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে, মানুষ থাকবে, নতুন প্রজন্ম থাকবে। সেই প্রজন্ম আমাদের কাছে হিসাব চাইবে -আমরা কি ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে সমান নাগরিক মর্যাদা দিয়েছিলাম, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকারে তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করেছিলাম?

সভ্যতার ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শক্তিশালীর জয়গাথা নয়; বরং দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার স্বীকার করার ইতিহাসও বটে।

তাই বাংলাদেশের সামনে পথ একটাই -কাউকে মুছে দিয়ে নয়, কাউকে অন্যের মধ্যে বিলীন করে নয়; বরং সমান নাগরিক অধিকার ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের নিরাপত্তাকে পাশাপাশি রেখে একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র নির্মাণ করা।

বাঙালি ও আদিবাসী -এই দুই পরিচয়কে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ একই সঙ্গে নিজের জাতিসত্তার মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ভোগ করবে।

পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, অধিকার নয়।
ইতিহাস আলাদা হতে পারে, মর্যাদা নয়।
সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, নাগরিকত্ব নয়।

এই ভারসাম্যই হতে পারে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
#