, ,

নারায়ণগঞ্জে প্রয়াত নার্স সুপারভাইজারের পেনশন-অবসর সুবিধা নিয়ে জটিলতা একই দপ্তরের তদন্তে আপত্তি, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

নিউজটি শেয়ার করুন

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের প্রয়াত নার্স সুপারভাইজার ফ্রানচিলিয়া গমেজের চাকরি, অবসর, পেনশন ও অন্যান্য অবসরজনিত প্রাপ্য সুবিধা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় একই দপ্তরের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনার উদ্যোগের বিরোধিতা করে নিয়োগকারী/নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অথবা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁর স্বামী রিচার্ড সৌরভ দেউড়ী। তাঁর অভিযোগ, শুধু প্রয়াত কর্মচারীর কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে তদন্ত করলে সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ও সম্ভাব্য গাফিলতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদন্তের বাইরে থেকে যেতে পারে।

তদন্ত নিয়ে আপত্তি, তবে তদন্ত বন্ধের দাবি নয় সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাঠানো তদন্ত/জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত পত্রের প্রেক্ষিতে দেওয়া আবেদনে রিচার্ড সৌরভ দেউড়ী স্পষ্ট করেছেন যে তিনি তদন্তের বিরোধিতা করছেন না। বরং তাঁর দাবি, তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, নথিভিত্তিক, পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণনির্ভর।

তাঁর প্রধান আপত্তি হলো—যেসব কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি গাফিলতি, বিলম্ব ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন, তাঁদের একই প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে তদন্ত পরিচালিত হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তিনি আবেদন করেছেন, সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী/নিয়ন্ত্রণকারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অথবা স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি পুনরায় পরীক্ষা করা হোক।

প্রয়াত কর্মচারীর ওপর একতরফা দায় না দেওয়ার দাবি আবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়াত ফ্রানচিলিয়া গমেজ বর্তমানে জীবিত না থাকায় কোনো অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষে সরাসরি বক্তব্য দেওয়া বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দায় নির্ধারণের আগে তাঁর চাকরিজীবনের সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।

আবেদনকারীর দাবি, তিনি সরকারি চাকরির প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রমের জন্য তাঁকে দায়ী করার আগে—

কে নির্দেশ দিয়েছিলেন;
কে অনুমোদন করেছিলেন;
কে নথি প্রস্তুত বা যাচাই করেছিলেন;
কোন কর্মকর্তার কাছে কখন ফাইল ছিল;
কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আটকে ছিল;
কোনো কর্মকর্তা নির্ধারিত দায়িত্ব যথাসময়ে পালন করেছিলেন কি না—
এসব বিষয় নথির মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

আবেদনে বলা হয়েছে, শুধু একজন মৃত কর্মচারীর ওপর দায় আরোপ করে তদন্ত শেষ করলে প্রকৃত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে উদঘাটিত নাও হতে পারে।

সার্ভিস বুক থেকে ফাইল মুভমেন্ট—সব নথি যাচাইয়ের দাবি প্রয়াত ফ্রানচিলিয়া গমেজের চাকরি, বেতন, চজখ, অবসর ও পেনশন সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি নথি তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

১. সার্ভিস বুক;
২. নিয়োগ ও পদায়ন সংক্রান্ত অফিস আদেশ;
৩. জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের নথি;
৪. রইঅঝ++ রেকর্ড;
৫. ইনক্রিমেন্ট ও বেতন পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত নথি;
৬. পিআরএল সংক্রান্ত আদেশ ও নথি;
৭. অবসর ও পেনশন ফাইল;
৮. না-দাবি পত্র;
৯. নোটশিট ও দাপ্তরিক সুপারিশ;
১০. ফাইল মুভমেন্ট ও নথি প্রেরণ-গ্রহণের রেকর্ড;
১১. সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পত্রাচার ও অফিস আদেশ।

আবেদনকারীর বক্তব্য, এসব নথি পর্যালোচনা করলে কোন পর্যায়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং কোথায় কোনো বিলম্ব, ত্রুটি বা প্রশাসনিক গাফিলতি ঘটেছে তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্যতা যাচাইয়ের দাবি আবেদনে প্রয়াত ফ্রানচিলিয়া গমেজের জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী প্রাপ্যতা পুনরায় যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

বেতন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, প্রযোজ্য গ্রেড ও মূল বেতন কত ছিল, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যথাযথভাবে প্রদান করা হয়েছিল কি না, বেতন পুনর্নির্ধারণের কোনো কার্যক্রম থাকলে তা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং সার্ভিস বুক ও রইঅঝ++-এর তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।

আবেদনকারীর দাবি, কোনো বেতন বা আর্থিক সুবিধা বকেয়া থাকলে তার কারণ ও দায়ও নথির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

ঘুষ বা অবৈধ আর্থিক দাবির অভিযোগ আবেদনে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। রিচার্ড সৌরভ দেউড়ীর দাবি, পেনশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর কাছে অবৈধ আর্থিক সুবিধা/ঘুষ দাবি করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথোপকথনের কল রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ তাঁর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি কোনো ব্যক্তিকে আগাম দোষী সাব্যস্ত না করে অভিযোগটির সত্যতা আইনানুগ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কল রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কলের সময়, কথোপকথনের প্রাসঙ্গিকতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করার আবেদন করেছেন।

অর্থাৎ অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—তা তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

পূর্ববর্তী তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন আবেদনকারীর অভিযোগ, এর আগে যে তদন্ত বা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, ফাইলের গতিপথ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা পুনরায় পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

তিনি জানতে চেয়েছেন—পূর্ববর্তী তদন্ত কেন করা হয়েছিল, কার নির্দেশে করা হয়েছিল, কোন কোন নথি পরীক্ষা করা হয়েছিল, কার কাছে কখন ফাইল ছিল, কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি বাদ পড়েছিল কি না এবং কোন কর্মকর্তা কী মতামত বা সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন।

তাঁর দাবি, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া পূর্ববর্তী তদন্তের পূর্ণতা ও নিরপেক্ষতা যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।

হাইকোর্টে রিট বিচারাধীন বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ৫২৬/২০২৬ বিচারাধীন রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারী জানিয়েছেন, তিনি আদালতের বিচারাধীন বিষয়কে পাশ কাটিয়ে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চান না। বরং মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ ও নির্দেশনার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ জানিয়েছেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের বিচারাধীন বিষয় এবং প্রশাসনিক তদন্তের মধ্যে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

নিয়োগকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনঃতদন্তের দাবি রিচার্ড সৌরভ দেউড়ীর মূল দাবি হলো, একই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিষয়টি নিয়োগকারী/নিয়ন্ত্রণকারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অথবা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুনঃতদন্ত করা।

তিনি চান, প্রয়াত ফ্রানচিলিয়া গমেজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অনুমোদনকারী, যাচাইকারী, তদারককারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিদের ভূমিকা একই সঙ্গে তদন্ত করা হোক।

১৩ দফা দাবি আবেদনে মোট ১৩টি দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

১. বর্তমান তদন্তের ভিত্তিতে কোনো একতরফা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
২. পূর্ববর্তী তদন্ত ও কার্যক্রমে কোনো গাফিলতি বা ত্রুটি হয়েছিল কি না তা তদন্ত করা।
৩. পূর্ববর্তী তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও গুরুত্বপূর্ণ নথি বাদ পড়েছিল কি না তা যাচাই করা।
৪. একই প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে নিয়োগকারী/নিয়ন্ত্রণকারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অথবা স্বাধীন তদন্ত মিটির মাধ্যমে পুনঃতদন্ত করা।
৫. প্রয়াত ফ্রানচিলিয়া গমেজের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা।
৬. জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী তাঁর আইনানুগ প্রাপ্যতা পুনঃযাচাই করা।
৭. সার্ভিস বুক, রইঅঝ++, বেতন নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট, অফিস আদেশ, নোটশিট, ফাইল মুভমেন্ট, চজখ, পেনশন ও অবসর-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা।
৮. দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি বা প্রশাসনিক ত্রুটি থাকলে নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা।
৯. অবৈধ আর্থিক দাবি/ঘুষের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট কল রেকর্ড আইনানুগভাবে যাচাই করা।
১০. আবেদনকারীকে তাঁর বক্তব্য, নথি ও প্রমাণ উপস্থাপনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া।
১১. তদন্ত শেষ হওয়ার আগে প্রয়াত ফ্রানচিলিয়া গমেজের বিরুদ্ধে একতরফা দায় আরোপ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
১২. তদন্ত শেষে প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনের অনুলিপি আবেদনকারীকে প্রদান করা।
১৩. প্রয়াত নার্স সুপারভাইজারের আইনানুগ পেনশন, আনুতোষিক ও অন্যান্য অবসরজনিত প্রাপ্য সুবিধা বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা।

“তদন্ত বন্ধ নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত চাই” আবেদনের শেষ অংশে রিচার্ড সৌরভ দেউড়ী স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি তদন্ত বন্ধ করতে চান না। তাঁর দাবি, তদন্ত হতে হবে এমনভাবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে আগাম দায়ী না করে সরকারি নথি, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা যায়।

তিনি বলেন, একজন মৃত কর্মচারীর ওপর একতরফাভাবে দায় চাপিয়ে সংশ্লিষ্ট জীবিত কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আড়াল করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। তাঁর দাবি, “দায় যার, নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ও তাঁরই নির্ধারণ করতে হবে।”

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন আবেদনটির অনুলিপি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট হিসাব কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অবগতির ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো—অভিযোগগুলো কতটা সত্য এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি ঘটেছিল কি না। আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী, এর উত্তর নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন পূর্ণ সরকারি নথি, ফাইলের গতিপথ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের নিরপেক্ষ যাচাই।

তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপরই শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনা ও দায়ের বিষয়টি নির্ধারিত হবে।