দুর্নীতির নাম শুনলে শরীর শিউরে ওঠে | আজ শুধু দুর্নীতি একটি অপরাধের নাম নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত আঘাত। যে অর্থ হাসপাতাল, শিক্ষা, সড়ক, কৃষি কিংবা কর্মসংস্থানে ব্যয় হওয়ার কথা, দুর্নীতির কারণে তার একটি অংশ অসাধু ব্যক্তিদের পকেটে চলে যায়।
এর মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য দায়িত্ব।
রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যতই ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী বা উচ্চপদস্থ হোন না কেন, তাঁকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক এবং অযথা বিলম্বমুক্ত। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো অভিযানই দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না।
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত, রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি পুনরুদ্ধার এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং উন্মুক্ত তথ্যপ্রকাশ দুর্নীতি কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।
দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা আর্থিক প্রভাব যেন তদন্ত ও বিচারে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। পাশাপাশি দুর্নীতির তথ্য প্রকাশকারী সাংবাদিক, অনুসন্ধানী গণমাধ্যম ও তথ্যদাতাদের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, সত্য প্রকাশের পরিবেশ না থাকলে দুর্নীতি আরও গভীরে শিকড় গাড়ে।
ইসলাম দুর্নীতি ও ঘুষকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা—উভয়ের ওপরই আল্লাহর অভিশাপ।” এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতি।
দুর্নীতিবাজদের প্রতি নরম মনোভাব, বিচারহীনতা কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে। তাই সময়ের দাবি দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, নিরপেক্ষ বিচার, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করা মানে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করা; আর দুর্নীতিবাজদের আইনের মুখোমুখি করা মানে রাষ্ট্রের মর্যাদা, জনগণের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের একমাত্র পথ। দুর্নীতিকে না বলি এই হোক আমাদের অভিপ্রায় |
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড







