, ,

দক্ষ কর্মী নিতে বাংলাদেশিদের জন্য ইতালির নতুন সুযোগ

নিউজটি শেয়ার করুন

ভাষা, পেশাগত দক্ষতা ও নাগরিক শিক্ষা দিয়ে নিরাপদ অভিবাসনের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নিরাপদ, নিয়মিত ও দক্ষতাভিত্তিক শ্রম অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ভাষা, নাগরিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করেছে বাংলাদেশ ও ইতালি। এর মাধ্যমে ইতালিতে যাওয়ার আগেই সম্ভাব্য কর্মীদের দেশটির ভাষা, আইন-কানুন, সামাজিক রীতিনীতি এবং সংশ্লিষ্ট পেশায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ, সিভিক অ্যান্ড প্রফেশনাল ট্রেনিং ফর স্কিলড মাইগ্রেশন টু ইতালি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এ উদ্যোগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) ড. মাহদী আমিন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো স্বাগত বক্তব্যে শ্রম অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ চলাচলের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ড. লরা নিকোল টম-বন্ডে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মসূচি প্রধান গুনজাম দাল্লাকোটি এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. এ এস এম ফজলুর রহমান।

অনুষ্ঠানে ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পরিচালিত প্রাক্‌-অভিবাসন প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, ইতালিতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে কর্মীদের ইতালীয় ভাষা, নাগরিক সচেতনতা এবং পেশাগত দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করে তোলা।

সংশ্লিষ্ট বক্তারা বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শুধু কাজের দক্ষতা থাকলেই যথেষ্ট নয়; যে দেশে একজন কর্মী যাবেন, সেই দেশের ভাষা, আইন, সংস্কৃতি ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে ধারণা থাকাও অত্যন্ত জরুরি। যথাযথ প্রস্তুতি থাকলে কর্মীরা নতুন পরিবেশে সহজে খাপ খাওয়াতে পারবেন এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

বিশেষ করে ইতালীয় ভাষায় দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ, ভাষাগত জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়া, নিজের অধিকার বোঝা এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

অনুষ্ঠানে ইতালিতে বৈধভাবে যাওয়ার প্রক্রিয়া, অভিবাসনসংক্রান্ত আইন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক শর্ত নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং বৈধ অভিবাসনপথ ও সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেন।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ইতালি ও বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পাশাপাশি ইতালিতে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ গ্রহণরত সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আতিথেয়তা ও বস্ত্র খাতের চাকরিপ্রত্যাশীরাও ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইতালির শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই উদ্যোগ বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটন ও বস্ত্রশিল্পের মতো খাতে কর্মীদের ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা বাড়লে তাঁদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা এবং কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়বে।

বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান শুধু বেকারত্ব কমানোর একটি মাধ্যম নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করারও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে দক্ষতা ও যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে অনেক অভিবাসী কর্মী বিদেশে গিয়ে ভাষাগত জটিলতা, কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা এবং নানা ধরনের শোষণের শিকার হন।

এ বাস্তবতায় ইতালিতে যাওয়ার আগে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কর্মীদের সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে দালালনির্ভরতা, প্রতারণা এবং অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রশিক্ষণের কার্যকর সংযোগ, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর।

ঢাকা ও রোমের মধ্যে শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ইতালিতে দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ইতালির চাহিদাসম্পন্ন খাতে প্রশিক্ষিত জনশক্তি সরবরাহের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সার্বিকভাবে, ইতালির এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনকে শুধু কর্মী পাঠানোর প্রচলিত ধারণা থেকে বের করে দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, আইনি সচেতনতা ও কর্মীর অধিকারভিত্তিক একটি আধুনিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।