, ,

তারুণ্যের আশা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আগামীর বাংলাদেশ গড়ি

নিউজটি শেয়ার করুন

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ

মোফাচ্ছেল চৌধুরী মানিক শাহ: প্রতি বছর ১১ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর পরিচালনা পর্ষদ এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বের জনসংখ্যা যখন ৫০০ কোটিতে পৌঁছায়, তখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন-সঠিক ব্যবহার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরি করার লক্ষ্যে এ দিবসের সূচনা করা হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রেক্ষাপটে “তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আগামীর বাংলাদেশ গড়ি” শীর্ষক বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। যা বিশ্বের খুব কম দেশেরই রয়েছে । এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, সৃজনশীল, সুস্থ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
*জনসংখ্যা: বোঝা নয়, সম্পদ* একসময় অধিক জনসংখ্যাকে উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জনসংখ্যাকে ভিন্নমাত্রায়, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। যথাযথ শিক্ষা, শৃঙ্খলা, দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে সেটিই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তথা বড় সম্পদ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো তার উজ্জ্বল উদাহরণ স্বরুপ আমরা দেখতে পাই। বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী কয়েক দশকে অর্থনৈতিক দ্রুত প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সামাজিকতার মানোন্নয়নসহ সামগ্রিক অগ্রগতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
*বাংলাদেশের তরুণ সমাজ:* সম্ভাবনার অফুরন্ত ভাণ্ডার
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ। উদ্যমী, মেধাবী, পরিশ্রমী, সৃজনশীল এবং প্রযুক্তিবান্ধব। তথ্যপ্রযুক্তি,বিজ্ঞান, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, গবেষণা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ব্যাপকহারে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে হাজার হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স, স্টার্টআপ, কৃষি উদ্যোক্তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সফলভাবে কাজ করছেন। বৈশ্বিক জলবায়ু রক্ষায় সচেতনতা এবং কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং এই তরুণরাই আগামীর স্মার্ট, উদ্ভাবনী ও আত্মনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ গঠনের মূল চালিকাশক্তি।
*তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা কী?* প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর কিছু মৌলিক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা থাকে। যেমন—
মানসম্মত শিক্ষা অর্জন
নিরাপদ ও সুস্থ জীবন, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ,সম্মানজনক কর্মসংস্থান, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, সামাজিক নিরাপত্তা, সমঅধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজ, সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ, উদ্যোক্তা হওয়ার সহায়তা, উদ্ভাবনে শক্তি বিকাশে সহায়ক পরিবেশ, লাবনী পণ্যের প্রচার ও প্রসার, প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য দেশ রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যদি এসব প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করে,তবে তরুণদের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে।

*শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের গুরুত্ব* একটি দেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা। তবে শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, প্রয়োজন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা। কথায় আছে, “পুঁথিগত বিদ্যা পরহস্তধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন”। প্রবাদের মর্মার্থ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে অবশ্যই। আর তাই আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি প্রযুক্তি, পরমাণু গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ এবং বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

*কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি* তারুণ্যের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো কর্মসংস্থান। শিক্ষাজীবন শেষে একজন তরুণ যখন উপযুক্ত কাজের সুযোগ পান না, তখন হতাশা,দুরাশা, বেকারত্ব এবং সামাজিক নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই সরকারি ও বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সহজ ঋণ সুবিধা, স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার প্রসার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। চাকরি খোঁজার পাশাপাশি চাকরি সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা তৈরিতেও গুরুত্ব দিতে হবে ব্যাপকহারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন শিক্ষা, ই-গভর্ন্যান্স, টেলিমেডিসিন, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল সেবার বিস্তার তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী। এজন্য তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, গ্রিন টেকনোলজি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার
আগামীর বাংলাদেশ গঠনে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব বিকাশে আরো বেশি উদ্যোগ এবং নারীবান্ধব বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। এরমধ্যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ, পরিবার পরিকল্পনা, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অবশ্যই অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে সুশিক্ষিত মা মানে সুশিক্ষিত জাতি। আর যে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী সেদেশে নারীকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করার সমান।

*স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক সুস্থতা* সুস্থ তরুণ সমাজই উন্নত জাতির ভিত্তি। তাই পুষ্টিকর খাদ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্য শিক্ষা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক সহমর্মিতা এবং ইতিবাচক পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।

*পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন* বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশের তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং টেকসই জীবনযাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সবুজ বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের অংশগ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি। সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; প্রয়োজন নৈতিকতা, সততা, মানবিকতা এবং দেশপ্রেম। তরুণদের মধ্যে সত্যবাদিতা, দুর্নীতিবিরোধী মনোভাব, সামাজিক দায়িত্ববোধ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা ও টেকসই জনসংখ্যা
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল বার্তা হলো পরিকল্পিত পরিবার, সুস্থ মা ও শিশু, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য নিশ্চিত করা। পরিকল্পিত পরিবার শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জনসংখ্যার গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা, নারী শিক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

*তরুণদের করণীয়* আগামীর বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের উচিত—
নিয়মিত শিক্ষা ও আত্মউন্নয়নে মনোযোগী হওয়া। প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা। উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা। পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করা।
মাদক, সন্ত্রাস ও সহিংসতা থেকে দূরে থাকা। স্বেচ্ছাসেবামূলক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নেওয়া।গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা।

*রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়* রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে প্রতিটি তরুণ তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। এজন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনকে ইতিবাচক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।

পরিশেষে, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জনসংখ্যা শুধু সংখ্যার বিষয় নয়; এটি উন্নয়ন, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনার এক অপরিহার্য বিষয়। বাংলাদেশের তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের স্বপ্ন, মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি ও কর্মক্ষমতাকে যথাযথভাবে বিকশিত করতে পারলে একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আসুন, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অঙ্গীকার হোক— “তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আগামীর বাংলাদেশ গড়ি।” তরুণদের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য এবং নৈতিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করেই আমরা একটি উন্নত, স্মার্ট, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ করতে পারব। এটাই হোক আমাদের আজকের প্রত্যয় এবং আগামী দিনের অঙ্গীকার।

প্রবন্ধকার : মোফাচ্ছেল চৌধুরী মানিক শাহ, লেখক- গবেষক, চেয়ারম্যান – বাংলা সাহিত্য একাডেমি। সাব-এডিটর, দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা, ঢাকা।
E-mail : manikshah247@gmail.com