, ,

টালিগঞ্জ জমিদার বংশের রাজ্জাকের সান্নিধ্যে একযুগ

নিউজটি শেয়ার করুন

অধ্যক্ষ খান আখতার হোসেনঃ ১৯৭৮ সাল। “কালো গোলাপ” চলচ্চিত্রের শুটিং হচ্ছে এফডিসি দুই নম্বর ফ্লোরে। আমার অনুজ ড. খান শওকত আমাকে নিয়ে গেলো এফডিসির এই স্যুটিং স্পটে। সাউন্ড ডাইরেক্টর মালেক মনসুরের মাধ্যমে শওকত আমাকে এফডিসিতে নিয়ে যায়। এই ছিল আমার জীবনের প্রথম এফডিসিতে যাওয়া। ফ্লোরে ঢুকতেই দেখি একটি গানে কন্ঠ মেলাচ্ছেন সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা ববিতা ও নায়ক রাজ্জাক। আমি অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকি তার দিকে। যে মানুষটির ছবি আমার পড়ার ঘরে শোভা পেতো, সেই মানুষটি আজ আমার সামনে! আমার স্বপ্নের নায়ক আজ বাস্তবে? এটা স্বপ্ন না বাস্তব? এই-ই শুরু। এফডিসিতে গিয়ে বুঝলাম চলচ্চিত্রাঙ্গন আমার মনে গভীরভাবে বসত গেড়েছে। রাজ্জাক আমার মনে গেড়ে বসলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে আমি ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে কাজ করা শুরু করি। দৈনিক দেশবাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজের সুবাদে গুণীজনদের কাছাকাছি আসার সুর‍্যোগ ঘটে। বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে সংস্কৃতির বিশাল অঙ্গনে প্রবেশ ছিলো আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। বিনোদন খবরের জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় কাজের সুজোগ আসে। এই সুজোগে সাপ্তাহিক মেঘনা, সাপ্তাহিক ডিটেকটিভ, সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী ও পাক্ষিক তারকালোকে নায়ক রাজ্জাককে নিয়ে লিখি। রাজ্জাককে নিয়ে সচিত্র সন্ধানীতে আমার নেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। বছরের চাকা না ঘুরতেই নায়ক রাজ্জাকের পরিবারের সাথেও সুসম্পর্ক হয়। প্রতি মাসে অন্ততঃ একবার হলেও তার গুলশানের বাসায় গেছি। এক পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সংবাদ কভারেজ করতে আমি বিভিন্ন শুটিং স্পটে গেছি বারবার। কুমিল্লা, রাজশাহী সিলেটে নায়ক-নায়িকাদের ফুটবল টুর্নামেন্টে তাঁর গাড়ীর সহযাত্রী হয়েছি। তাঁর সাথে সম্পর্ক এতটা গভীর ছিল যে তিনি রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের অফিসে আমাকে নিয়ে আলাপ আলোচনা করতেন। তারই উৎসাহে কুরুচিপূর্ণ ছবি নির্মাণ রোধ করতে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে যোগ দেই। গঠন করি ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি। ‘তালাক’ ছবির উপর দিনব্যাপী আলোচনা সেশনে তিনি যোগ দেন। বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট এন্ড আর্কাইভ মিলনাতনে ‘তালাক’ ছবির অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন নায়িকা ববিতা, অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সুরকার সত্য সাহা, চিত্র সম্পাদক নূরুন্নবী, চিত্র সাংবাদিক চিন্ময় মুৎসুদ্দী এবং ওই ছবির পরিচালক আজহারুল ইসলাম খান। ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নায়ক রাজ্জাক। তাঁকে আজ ভীষণ মনে পড়ছে। তিনি শুধু অভিনেতাই ছিলেন না, একজন মানবিক মানুষ ছিলেন। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে চলচ্চিত্রের সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করতো।

একজন মানুষ কীভাবে একটি জাতির বিনোদনের ভাষা হয়ে ওঠেন, রাজ্জাক তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ভারতের মাটিতে জন্ম নিয়ে তিনি বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাঁর জীবনটা ছিল সংগ্রাম, স্বপ্ন আর সৃষ্টির উপাখ্যান।

আব্দুর রাজ্জাক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ২৩শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জে। পিতার নাম আকবর হোসেন, মাতার নাম নিসারুননেছা। রাজ্জাকরা ছিলেন নাকতলা এলাকার জমিদার পরিবার। শৈশব কেটেছে কলকাতার বাঁশদ্রোণীর নিকটে খানপুর হাইস্কুলে। স্কুলে তিনি অঙ্কে কাঁচা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে রাজ্জাকের বাল্যবন্ধু টি দাস বলেন, স্কুলের শিক্ষকেরা তাকে বলতেন, “অঙ্কটা অন্তত ভালো করে শেখ। যোগ বিয়োগ ঠিকঠাক করে না শিখলে পরিবারের এত সম্পত্তি সামলে রাখবি কি করে।” কিন্তু রাজ্জাকের মন পড়ে থাকত মঞ্চে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতী পূজা চলাকালে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য তার শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নেন। শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক “বিদ্রোহী”তে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা। এরপর আর পেছনে ফেরা হয়নি। অভিনয়ের টানে ১৮ বছর বয়সে মুম্বইয়েও যান রাজ্জাক। সেখানে থিয়েটার একাডেমিতে ভর্তি হয়ে ক্যামেরা, লাইট, সংলাপের কারিগরি শিখেছেন।

পারিবারিক জীবনে রাজ্জাক ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল। ১৯৬২ সালে তিনি বিয়ে করেন খায়রুন্নেসা লক্ষ্মীকে। টালিগঞ্জে রাজ্জাকের এক আত্মীয়ের বাড়ির পাশে ছিল লক্ষ্মীদের বাড়ি। সেই আত্মীয়দের একজন লক্ষ্মীকে বাড়ির সামনে দেখে পছন্দ করে এবং বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। সেদিন রাজ্জাক আর লক্ষ্মীর আংটিবদল হয়। এর দুই বছর পরে তাদের বিয়ে হয়। লক্ষ্মী দৈনিক প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “অনেকেই আমাকে হিন্দু মনে করেন। আমার পুরো নাম খায়রুন্নেসা। আমার আব্বা আমাকে আদর করে ডাকতেন ‘লক্ষ্মী’ বলে।” সংসার জীবনে রাজ্জাক-লক্ষ্মী দম্পতির চার সন্তান। বড় ছেলে বাপ্পারাজ নব্বই দশকের জনপ্রিয় নায়ক, পরে পরিচালনায় যুক্ত হন। মেজো ছেলে সম্রাট ব্যবসা করেন। ছোট ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও পরিচালনার সাথে আছেন। একমাত্র মেয়ে অনজনা যুক্তরাষ্ট্রে সংসার করছেন। গুলশানের বাসাটি ছিল শিল্পী-সাংবাদিকদের মিলনকেন্দ্র। রাজ্জাক বলতেন, “পরিবার ঠিক না থাকলে শিল্পী হওয়া যায় না।”

১৯৬৪ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে এক রাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন রাজ্জাক। পরের দিন ২৬ এপ্রিল পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তার সাথে ছিল স্ত্রী লক্ষ্মী ও পুত্র বাপ্পারাজ এবং পীযূষ বসুর দেওয়া একটি চিঠি ও পরিচালক আব্দুল জব্বার খান ও শব্দগ্রাহক মণি বোসের ঠিকানা। স্ত্রী-পুত্রকে শরণার্থী শিবিরে রেখে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সাক্ষাৎ করলে খান তাকে আশ্বাস দেন। তখন রাজ্জাক ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কমলাপুরে এক বাসা ভাড়া করেন। পকেটে টাকা নেই, কাজ নেই। তবু স্বপ্ন ছিল। পরে তিনি সুভাষ দত্ত, সৈয়দ আওয়াল, এহতেশামসহ আরও চলচ্চিত্রকারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আব্দুল জব্বার খানই তাকে ইকবাল ফিল্মসে কাজ করার সুযোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কামাল আহমেদের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে “উজালা” চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। সহকারী পরিচালক হিসেবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল “পরওয়ানা”। কিন্তু ৮০ ভাগ কাজ হওয়ার পর তিনি এই ছবির কাজ ছেড়ে দেন।

বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে ১৯৬৬ সালে “১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন” চলচ্চিত্রে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আসল পরিচয় মেলে জহির রায়হানের “বেহুলা” চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এরপর আর থামতে হয়নি। ষাটের দশকের শেষের দিকে এবং সত্তরের দশকেও তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান অভিনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হত। বাংলা চলচ্চিত্র পত্রিকা “চিত্রালী”র সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাকে “নায়করাজ” উপাধি দেন। সেই উপাধি তিনি আমৃত্যু ধারণ করেছেন।

অভিনয় জীবনে তিনি প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে “বেহুলা”, “আগুন নিয়ে খেলা”, “এতটুকু আশা”, “নীল আকাশের নিচে”, “জীবন থেকে নেয়া”, “ওরা ১ জন”, “অবুঝ মন”, “রংবাজ”, “আলোর মিছিল”, “অশিক্ষিত”, “ছুটির ঘণ্টা”, “বাবা কেন চাকর” এবং “বড় ভালো লোক ছিল”। কাজী জহির পরিচালিত “অবুঝ মন” ছবিতে রাজ্জাক সদ্য পাস করা এক ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করেন, যে ধর্ম ও সমাজের খাতিরে তার প্রেমকে বিসর্জন দেয়। একই বছর তাকে শাবানার বিপরীতে দেখা যায় “ওরা ১১ জন” এবং “চৌধুরী বাড়ি” ছবিতে। মাসুদ পারভেজ প্রযোজিত এবং চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত “ওরা ১ জন” বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র। এছাড়া ১৯৭২ সালে তিনি কামাল আহমেদের “অশ্রু দিয়ে লেখা”, বাবুল চৌধুরীর “প্রতিশোধ”, ইবনে মিজানের “কমলা রাণীর দীঘি”, এস এম শফির “ছন্দ হারিয়ে গেল” এবং নারায়ণ ঘোষ মিতার “এরাও মানুষ” চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

শাবানার সাথে তার জুটি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। পরে তিনি শাবানার বিপরীতে সর্বাধিক ৪০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ববিতা, কবরী, সুচন্দা, সুচরিতা, অঞ্জনার সাথেও তার রসায়ন দর্শক মুগ্ধ হয়ে দেখেছে। ১৯৮৯ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত “বিষবৃক্ষ” উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত “বিরহ ব্যথা” চলচ্চিত্রে নগেন্দ্রনাথ চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি পরিচালনা করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এতে তার বিপরীতে ছিলেন ববিতা ও চম্পা। এছাড়া এই বছর তার অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো হল সত্য সাহার “রাম রহিম জন”, শেখ নজরুল ইসলামের “বিধাতা”, শিবলি সাদিকের “দুর্নাম”, শফিকুর রহমানের “রাজা মিস্ত্রী”, সুভাষ দত্তের “সহধর্মিণী”, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের “শর্ত”, এবং আজিমের “দেবর ভাবী”।

অভিনয়ের পাশাপাশি রাজ্জাক নিজেকে নির্মাতা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেন। তার মালিকানার “রাজলক্ষী প্রোডাকশন” থেকে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তিনি সব মিলিয়ে ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলো হলো “মৌচোর”, “বদনাম”, “পাগলা রাজা”, “ঢাকা ৮৬”, “চাঁপা ডাঙ্গার বউ”, “জিনের বাদশা”, “রাজামিস্ত্রি”, “প্রফেসর”, “বাবা কেন চাকর”, “সন্তান যখন শত্রু”, “আমি বাঁচতে চাই”, “মন দিতে চাই” ইত্যাদি। ২০১৩ সালে তিনি তার পুত্র সম্রাটকে নিয়ে নির্মাণ করেন “আয়না কাহিনী”। ইমদাদুল হক মিলন রচিত কাহিনী অবলম্বনে ছবিটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন রাজ্জাক নিজেই। এটি তার পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র। ছবিতে সামাজিক ব্যধি হিসেবে যৌতুক প্রথার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

নব্বই দশকের পর রাজ্জাক কলকাতার টালিউডেও কাজ করেছেন। ১৯৯৮ সালে অঞ্জলি ফিল্মসের ব্যানারে “বাবা কেন চাকর” ছবিটি টালিউডে পুনঃনির্মিত হয়। এতে রাজ্জাকের অভিনীত চরিত্রের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও তার বিপরীতে ছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ছবিটি কলকাতায়ও ব্যবসাসফল হয়। পরে তিনি স্বপন সাহা পরিচালিত “স্বার্থপর”, রবি কিনাগী পরিচালিত “অন্নদাতা” ২০০২, সৃজিত গুহা পরিচালিত “নায়ক”, এবং স্বপন সাহা পরিচালিত “দেবদূত” ২০০৪, “অন্যায় অত্যাচার” ২০০৪ ও “জন্মদাতা” ২০০৮ ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবিগুলোতে তাকে বাড়ির প্রভাবশালী গৃহকর্তারূপে দেখা যায়। এছাড়া তিনি ২০০৬ সালে “হিরো” ও “এরই নাম প্রেম” ছবিতে অভিনয় করেন। “হিরো” ছবিতে তিনি পুলিশ কনস্টেবল ভবানী শঙ্কর চরিত্রে অভিনয় করেন।

দুই হাজার দশকের পর রাজ্জাক মূলত: পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই সময়ে তিনি অনন্ত জলিল-বর্ষা অভিনীত “হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ” ২০১ এবং “মোস্ট ওয়েলকাম” ২০১২ ছবিতে অভিনয় করেন। পরের বছরগুলোতে রাজ্জাক পরিচালক জুটি শাহীন-সুমন পরিচালিত এবং মাহিয়া মাহি ও বাপ্পি চৌধুরী জুটির “ভালোবাসার রঙ” ২০১২ ছবিতে শামসুদ্দীন চৌধুরী চরিত্রে এবং “অন্যরকম ভালোবাসা” ২০১৩ ছবিতে অভিনয় করেন। ২০১৩ সালে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজ্জাক, সোহেল রানা ও আলমগীরকে একসাথে দেখা যায় “জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার” চলচ্চিত্রে। এফ আই মানিক পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে রাজ্জাককে জজের ভূমিকায় দেখা যায়। একই বছর তিনি পার্শ্বচরিত্রে শফি উদ্দিন শফি পরিচালিত “পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী” ছবিতে সামাদ শিকদার এবং অনন্ত জলিল পরিচালিত “নিঃস্বার্থ ভালোবাসা”য় বর্ষার দাদুর ভূমিকায় অভিনয় করেন।

২০১৪ সালে তিনি নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল পরিচালিত এবং ফেরদৌস আহমেদ প্রযোজিত “এক কাপ চা” চলচ্চিত্রে অতিথি চরিত্রে এবং সামিয়া জামান পরিচালিত “আকাশ কত দূরে” ছবিতে অভিনয় করেন। ২০১৫ সালে তার বড়পুত্র বাপ্পারাজ পরিচালিত “কার্তুজ” ছবিতে অভিনয় করেন। এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন তারই ছোট পুত্র সম্রাট। ২০১৬ সালে রাজ্জাক “ফুলের মতো পবিত্র” টেলিভিশন চলচ্চিত্রে চেয়ারম্যানের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এটি তার নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন্স থেকে নির্মিত হয় এবং পরিচালনা করেন তার পুত্র খালিদ হোসেন সম্রাট। এর আগেও রাজ্জাক সম্রাটের পরিচালনায় “দায়ভার” টেলিভিশন চলচ্চিত্রে কাজ করেন।

পুরস্কার ও সম্মাননার ক্ষেত্রে রাজ্জাক ছিলেন অনন্য। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে তিনি মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাথে জড়িয়ে ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক।

সামাজিক কাজে রাজ্জাক সবসময় অগ্রণী ছিলেন। আমি নিজে যেমন তার উৎসাহে ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি গঠন করেছি, তেমনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি কুরুচিপূর্ণ ছবির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ‘তালাক’ ছবির উপর দিনব্যাপী আলোচনা সেশনে তিনি প্রধান অতিথি হয়ে বলেছিলেন, “সিনেমা হবে সমাজের দর্পণ। যুবসমাজকে নষ্ট করে এমন কিছু আমরা বানাব না।” বাংলাদেশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট এন্ড আর্কাইভ মিলনাতনে সেই অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন নায়িকা ববিতা, অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, সুরকার সত্য সাহা, চিত্র সম্পাদক নূরুন্নবী, চিত্র সাংবাদিক চিন্ময় মুৎসুদ্দী এবং ওই ছবির পরিচালক আজহারুল ইসলাম খান। রাজ্জাক শুধু মঞ্চে বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নতুন পরিচালকদের অর্থ দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের অফিসে বসে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নতুনদের স্ক্রিপ্ট শুনতেন।

রাজ্জাকের ব্যক্তিজীবন ছিল শৃঙ্খলা ও মানবিকতায় ভরা। শুটিং স্পটে তিনি সবার আগে আসতেন, সবার শেষে যেতেন। জুনিয়র শিল্পীদের সংলাপ মুখস্থ করিয়ে দিতেন। কেউ অসুস্থ হলে নিজে হাসপাতালে ছুটে যেতেন। কুমিল্লা, রাজশাহী, সিলেটে নায়ক-নায়িকাদের ফুটবল টুর্নামেন্টে তিনি অংশ নিতেন। অতিথি হিসেবেও খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতেন, পুরস্কার তুলে দিতেন। তার গাড়িতে চড়ে আমি দেখেছি কীভাবে একজন সুপারস্টারও মাটির মানুষ হতে পারেন।

রাজ্জাক ২০১৭ সালের ২১শে আগস্ট সন্ধ্যা ৬:১৩ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। ২৩শে আগস্ট তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। খবর ছড়ানোর সাথে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। এফডিসির গেটে, রাজপথে, টিভি পর্দায় শুধু একটাই নাম “নায়করাজ”।

আজ ২০২৬ সাল। রাজ্জাক নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ৩০০টি ছবি, ১৬টি পরিচালনা, অসংখ্য স্মৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। যখন “অশ্রু দিয়ে লেখা”র গান বাজে, যখন “বড় ভালো লোক ছিল”র শেষ দৃশ্য চোখ ভেজায়, তখন বুঝি রাজ্জাক মরেননি। তিনি আমাদের ঘরের মানুষ হয়ে আছেন।

ভারতের টালিগঞ্জ থেকে এসে তিনি শুধু চলচ্চিত্রাঙ্গন দখল করেননি, তিনি কোটি বাঙালির হৃদয় জয় করেছেন। আমার জীবনের একযুগ তিনি আলো দিয়েছেন। সাংবাদিক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, ছাত্র হিসেবে আমি তার কাছে ঋণী।

নায়করাজ রাজ্জাক অমর। কারণ সত্যিকারের নায়করা পর্দা থেকে নেমে গেলেও মানুষের মনে বেঁচে থাকে।