গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন সাতাইশ রাজনগর এলাকায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মাফিজুল ইসলাম (৪২) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক পরিবারের সদস্যদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জোরপূর্বক জমি দখলের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্তের কর্মকাণ্ডে এলাকার কয়েকটি পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে টঙ্গীর সাতাইশ রাজনগর এলাকায় বসবাস করে আসছেন। নিজেদের ক্রয়কৃত ও ভোগদখলীয় জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ এবং স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে মাফিজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের বাধা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে তাঁদের অভিযোগ।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পারুল বড়ুয়া অভিযোগ করে বলেন, রাজনগর এলাকায় তাঁর সাড়ে চার কাঠা জমি রয়েছে। তিনি সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য হওয়ায় অভিযুক্ত মাফিজুল ইসলাম তাঁকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন। কিছুদিন আগে মাফিজুল তাঁর কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা ধার নিলেও এখন পর্যন্ত তা ফেরত দেননি। পাওনা টাকা চাইতে গেলে উল্টো তাঁকে নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
পারুল বড়ুয়া আরও অভিযোগ করেন, মাফিজুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি ইতোমধ্যে আদালতে মামলা করেছেন। মামলা করার পর থেকে অভিযুক্ত ও তাঁর সহযোগীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এলাকার মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে তাঁর বাড়ির আশপাশে মহড়া দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। এতে যেকোনো সময় তাঁর পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় তিনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।
অন্য ভুক্তভোগী আব্দুল আজিজ অভিযোগ করে বলেন, তিনি রাজনগর এলাকায় দুই কাঠা জমি ক্রয় করেছেন। কিন্তু ওই জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করতে গেলে মাফিজুল ইসলাম তাঁকে বাধা দেন। এমনকি নিজের ক্রয়কৃত জমিতে প্রবেশ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়েছে। এলাকায় গেলে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তিনি বলেন, নিজের বৈধভাবে কেনা জমিতে বসবাস ও নির্মাণকাজ করার অধিকার ফিরে পেতে চান এবং অভিযুক্তের হয়রানি থেকে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী ফাতেমা বেগম অভিযোগ করেন, তিনি মাফিজুল ইসলামের কাছ থেকে এক কাঠা জমি ক্রয় করেন। জমির খাজনা-খারিজের কাজ সম্পন্ন করার জন্য তাঁকে দেড় লাখ টাকা প্রদান করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং জমির বিষয়ে কথা বলতে গেলে উল্টো তাঁর পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানান তিনি। জমি বুঝিয়ে দেওয়া এবং হয়রানির ঘটনায় ন্যায়বিচার দাবি করেন ফাতেমা বেগম।
এদিকে ভুক্তভোগী চিকিৎসক মঞ্জু জানান, তিনি রাজনগর এলাকায় জমি ক্রয় করে দীর্ঘদিন ধরে টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন। সম্প্রতি ওই বসতভিটায় বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিলে মাফিজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীরা নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ইট-বালু প্রবেশ করতে বাধা দেন এবং তাঁকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন। এ ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
চিকিৎসক মঞ্জু আরও বলেন, রাজনগর এলাকার সাধারণ মানুষ জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির কারণে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। একজন নাগরিক হিসেবে নিজের ক্রয়কৃত জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ ও নিরাপদে বসবাস করার অধিকার সবার রয়েছে। তাই এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা বলেন, জমি কেনাবেচা, টাকা লেনদেন এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কেউ নিজের জমিতে বাড়ি নির্মাণ করতে পারছেন না, কেউ জমি বুঝে পাচ্ছেন না, আবার কেউ পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে হুমকি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এসব ঘটনায় একাধিক পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জমিসংক্রান্ত বিরোধের আইনানুগ নিষ্পত্তি এবং হুমকি-ধমকির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মাফিজুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা সাপেক্ষে প্রকৃত ঘটনা ও দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন।







