একসময় মঞ্চে উঠতেন, গান গাইতেন, অভিনয়ে মাতিয়ে রাখতেন দর্শকদের। বাদ্যযন্ত্রের সুরে প্রাণ পেত আসর। সেই শিল্পীজীবনে কত স্মৃতি, কত মানুষের ভালোবাসা আর কত পুরস্কার জমা হয়েছে তাঁর ঝুলিতে। অথচ সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সবকিছু। বয়স এখন ৮২ বছর। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পের সঙ্গে থাকা ঠাকুর পদ সরকার এখনো গান করেন, কিন্তু আগের মতো আর ডাক আসে না। শিল্পীর জীবনে এই নীরব পরিবর্তন যেন এক দীর্ঘ পথচলার বিষণ্ন অধ্যায়।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার কাকীলাখালি গ্রামে জন্ম ঠাকুর পদ সরকারের। তাঁর বাবা পঞ্চানন সরকার। জীবনের প্রায় ৭০ বছর তিনি কাটিয়েছেন গানের জগতে। গান তাঁর কাছে শুধু বিনোদন কিংবা জীবিকা নয়, এটি তাঁর ভালোবাসা, তাঁর অভ্যাস, তাঁর বেঁচে থাকার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাঁর শিল্পীজীবনের পরিধি ছিল বহুমুখী। ‘রূপবান’, ‘সাগরভাসা’, ‘রাখাল বন্দি’, ‘মানিক যাত্রা’, ‘বন্দির ছেলে’, ‘রঘু ডাকাত’ ও ‘ইমাম যাত্রা’র মতো যাত্রাপালায় যুক্ত ছিলেন তিনি। নামকীর্তন, অধিবাস কীর্তন, পালাকীর্তন ও রামায়ণ পরিবেশনাতেও ছিল তাঁর অংশগ্রহণ। গানের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো এবং অভিনয়েও ছিলেন দক্ষ। মঞ্চের পরিবেশ, চরিত্রের অভিনয় আর সুরের মূর্ছনায় দর্শকদের আনন্দ দেওয়াই ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের পরিচিত ছবি।
বিভিন্ন মঞ্চে গান গেয়ে পেয়েছেন পুরস্কার ও সম্মাননা। সেই স্বীকৃতিগুলো তাঁর দীর্ঘ সাধনার স্মারক। কিন্তু একজন শিল্পীর জীবনে পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি হয়তো শ্রোতার ভালোবাসা, আবার সবচেয়ে বড় কষ্ট হতে পারে সেই পরিচিত মঞ্চ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া।
ঠাকুর পদ সরকার এখনো গান করেন। তবে বয়সের কারণে আগের মতো অনুষ্ঠান থেকে ডাক পান না। যে মানুষটির জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে মঞ্চে, গান আর অভিনয়ের পরিবেশে, তাঁর কাছে এই পরিবর্তন কতটা বেদনাদায়ক, তা সহজেই অনুভব করা যায়। শিল্পীর কণ্ঠে গান থাকতে পারে, মনে থাকতে পারে অসংখ্য সুর ও সংলাপ; কিন্তু সেই প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ না মিললে মনেও জমে নিঃসঙ্গতা।
ঠাকুর পদ সরকারের কথায়, “গান নিয়েই আমার জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেছে। গান করেছি, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছি, অভিনয় করেছি। বিভিন্ন মঞ্চে গান গেয়ে পুরস্কার পেয়েছি, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এখনো গান করি, কিন্তু বয়স হয়েছে বলে আগের মতো আর ডাক পাই না। গান ছাড়া আমি যেন কিছুই বুঝি না। যত দিন বেঁচে থাকব, গানের সঙ্গেই থাকতে চাই।”
একজন শিল্পীর জীবনের মূল্য শুধু তাঁর বয়স কিংবা বর্তমান ব্যস্ততা দিয়ে বিচার করা যায় না। যে মানুষটি কয়েক দশক ধরে লোকজ সংস্কৃতির নানা ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের জন্য সম্পদ। ঠাকুর পদ সরকারের মতো প্রবীণ শিল্পীদের গান শোনার আয়োজন, তাঁদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
সময় একদিন সবার জীবনেই পরিবর্তন আনে। মঞ্চের আলোও একসময় ম্লান হয়। কিন্তু একজন শিল্পীর সাধনা মুছে যায় না। কেশবপুরের ঠাকুর পদ সরকারের জীবনে গান আজও বেঁচে আছে—হয়তো আগের মতো ঘন ঘন মঞ্চে নয়, কিন্তু তাঁর ভালোবাসায়, স্মৃতিতে এবং দীর্ঘ শিল্পীজীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে।







