, ,

গণভোটের বৈধতা ও সংসদের সার্বভৌমত্ব: জুলাই সনদের সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব

নিউজটি শেয়ার করুন

রাসেল আহমদ:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোট বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সংখ্যাগত বিচারে এটি একটি সুস্পষ্ট ফল দিয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়ী। কিন্তু সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বৈধতা কেবল ফলাফলের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না। তা নির্ধারিত হয় প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা, অংশগ্রহণের মান, প্রশ্নের স্পষ্টতা এবং প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে জুলাই সনদ-সংক্রান্ত গণভোট আমাদের সামনে এক গভীর তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব উন্মোচিত করেছে। তা হলো,জনগণের প্রত্যক্ষ সার্বভৌমত্ব বনাম সংসদের সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব।গণভোটের সরকারি ফলাফল বলছে, বৈধ ভোটের প্রায় ৬২ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং প্রায় ২৯ শতাংশ ‘না’। মোট ভোটারের প্রায় ৬১ শতাংশ অংশ নিয়েছেন; প্রায় ৩৯ শতাংশ অংশ নেননি। প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সংবিধান-রাষ্ট্রের মৌলিক চুক্তি-পরিবর্তনের প্রশ্নে অংশগ্রহণের গভীরতা এবং বোঝাপড়ার পরিসর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবিধানিক তত্ত্বে গণভোটকে প্রায়ই “constituent power in action” বলা হয়। অর্থাৎ জনগণের প্রতিষ্ঠাতা ক্ষমতার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ। কিন্তু এই প্রয়োগ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশ্নটি স্পষ্ট, বিকল্পগুলো পৃথক এবং ভোটারগণ সুস্পষ্টভাবে অবগত হন।

জুলাই সনদের অধীনে উপস্থাপিত ৪৮টি প্রস্তাব একক প্রশ্নমালায় গুচ্ছবদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন, ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্তি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে উভয়কক্ষের অনুমোদন,এসব মৌলিক ও পারস্পরিকভাবে ভিন্নধর্মী প্রস্তাবকে একত্রে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। তুলনামূলক সাংবিধানিক অনুশীলনে এ ধরনের পদ্ধতিকে “bundled referendum” বলা হয়, যা সমালোচিত, কারণ এটি ভোটারকে প্রতিটি প্রস্তাব সম্পর্কে পৃথক মত দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। ফলে গণরায় সামগ্রিক হলেও নির্দিষ্ট নয়; সম্মতি আংশিক না সামগ্রিক,তা স্পষ্ট হয় না।

এই পরিস্থিতিতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়,গণভোট কি সংসদকে বাধ্য করে? গেজেট অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘হ্যাঁ’ এলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করবে। কিন্তু সাংবিধানিক নীতিতে প্রতিষ্ঠিত যে কোনো সংসদ তার কার্যকালের মধ্যে আইন প্রণয়ন ও বাতিলের ক্ষমতায় স্বাধীন, এবং কোনো সংসদ পরবর্তী সংসদের সার্বভৌমত্ব খর্ব করতে পারে না। এই নীতিকে “continuing parliamentary sovereignty” বলা হয়। গণভোট রাজনৈতিক নির্দেশনা দিতে পারে, কিন্তু সংসদের আইনগত স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে লোপ করতে পারে না। যদি না সংবিধানে তার স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত থাকে।

বাংলাদেশের সংবিধান জনগণকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সেই ক্ষমতার প্রয়োগ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয় প্রধানত সংসদের মাধ্যমে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনগণ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিনিধি নির্বাচন করে প্রয়োগ করেন। সরাসরি গণভোট এই কাঠামোয় একটি ব্যতিক্রমী উপাদান। এই ব্যতিক্রম তখনই বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত, যখন তা প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোকে পরিপূরক করে, তাকে অতিক্রম বা অবমূল্যায়ন করে না। যদি গণভোট সংসদীয় বিতর্কের ক্ষেত্র সংকুচিত করে বা প্রতিনিধিদের স্বাধীন বিচারবোধকে অবদমিত করে, তবে তা সাংবিধানিক ভারসাম্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে।

প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতাও বৈধতার অন্যতম শর্ত। গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’-এর পাশে টিক এবং ‘না’-এর পাশে ক্রস চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়টি কেবল নকশাগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। “Ballot neutrality” নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বিকল্পগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী পক্ষপাত এড়ানো। টিক চিহ্নকে সাধারণত সঠিক বা গ্রহণযোগ্য এবং ক্রসকে ভুল বা বাতিলের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এমন সামাজিক অভ্যাস অস্বীকার করা যায় না। সেক্ষেত্রে উভয় বিকল্পে সমরূপ নিরপেক্ষ চিহ্ন ব্যবহার না করা প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতার প্রশ্ন উত্থাপন করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফল ঘোষণার ধরণ ও অংশগ্রহণের পরিসংখ্যানগত অসামঞ্জস্য। একই দিনে, একই ভোটার তালিকায় অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশগ্রহণের হারে ভিন্নতা দেখা গেছে। ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে কিছু ভোটার নাকি কেবল গণভোটে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু গোপন ব্যালটের নীতি অনুসারে কে কোন ভোট দিয়েছেন তা জানার সুযোগ নেই। ফলে এই ব্যাখ্যা তথ্যগত ভিত্তির প্রশ্ন তোলে। সাংবিধানিক বৈধতা কেবল ফলাফলের গাণিতিক যথার্থতায় নয়, বরং প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতায় নির্ভর করে। যেখানে ব্যাখ্যায় দ্বৈততা বা অস্পষ্টতা থাকে, সেখানে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

গণভোটের আঞ্চলিক ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকটি আসনে ‘না’ জয়ী হয়েছে। যার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা এবং আরও কয়েকটি অঞ্চল রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি রাষ্ট্রব্যাপী সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে বটে, কিন্তু সাংবিধানিক বহুত্ববাদ (constitutional pluralism) সংখ্যালঘু অঞ্চলের মতামতকেও গুরুত্ব দেয়। একে বলা হয় “counter-majoritarian concern”  -সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্ত সংখ্যালঘুর অধিকার ও রাজনৈতিক অভিমতকে কতটা সুরক্ষিত রাখছে। যদি কোনো অঞ্চল স্পষ্টভাবে একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তবে সেই বার্তাকে উপেক্ষা করে সর্বজনীন বাস্তবায়ন রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

জুলাই সনদের আরেকটি সাংঘর্ষিক দিক হলো,সংবিধান সংস্কার পরিষদের গৃহীত সংশোধনে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। সাধারণ আইন প্রণয়নে রাষ্ট্রপতির সম্মতি একটি সাংবিধানিক ধাপ; সংবিধান সংশোধনের মতো মৌলিক বিষয়ে এই ধাপ বাদ দেওয়া ক্ষমতার ভারসাম্য নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে। একদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব, অন্যদিকে সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে তাকে কার্যত অব্যাহতি দেওয়ার শামিল। এটি নীতিগত সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তোলে।

এখানে আরও একটি তাত্ত্বিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়,গণভোটের নৈতিক ম্যান্ডেট বনাম আইনগত বাধ্যবাধকতা। গণভোট যদি একটি নৈতিক ম্যান্ডেট হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে সংসদের দায়িত্ব হবে তা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা, কিন্তু সমালোচনামুক্ত অনুমোদন দেওয়া নয়। সংসদীয় বিতর্ক, বিশেষজ্ঞ মতামত, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ,এসবের মাধ্যমে প্রস্তাবসমূহ পরিশোধিত হতে পারে। কিন্তু যদি গণভোটকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ও অচলনীয় ধরা হয়, তবে তা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

সাংবিধানিক গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত ভারসাম্যে।সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি, সংখ্যালঘুর অধিকার, প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্যের সমন্বয়ে। জুলাই সনদ-সংক্রান্ত গণভোট এই চারটি স্তম্ভের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট করেছে। একদিকে রয়েছে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের দাবি; অন্যদিকে রয়েছে সংসদের বিবেচনামূলক ক্ষমতা। একদিকে রয়েছে দ্রুত সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা; অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজন।

রাষ্ট্রের সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন। ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা,এসব প্রশ্নে পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। কিন্তু সংস্কারের বৈধতা তার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের নামে যদি এমন একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে বোঝাপড়ার সীমাবদ্ধতা, নকশাগত প্রশ্ন এবং পরিসংখ্যানগত অস্পষ্টতা রয়ে যায়, তবে সেই সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

অতএব, এখন দায়িত্ব নবনির্বাচিত সংসদের। তাদের সামনে দ্বৈত কর্তব্য-গণভোটের ফলকে সম্মান জানানো এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক পরিপক্বতার পরিচয় দেওয়া। ৪৮টি প্রস্তাব পৃথকভাবে বিশ্লেষণ, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের মধ্য দিয়ে গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে। সংখ্যার জোরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়; বরং যুক্তির ভিত্তিতে স্থায়ী সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রের স্বার্থে উত্তম।

গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সেই সিদ্ধান্তকে সীমিত করে ন্যায়, ভারসাম্য ও প্রক্রিয়াগত সততা। জুলাই সনদ-সংক্রান্ত গণভোট আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে,জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রত্যক্ষ প্রকাশ ও প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় কাঠামোর সম্পর্ক কখনো সরল নয়। সেই সম্পর্কের সুষম সমাধানই নির্ধারণ করবে, এই গণভোট ইতিহাসে গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি সাংবিধানিক বিতর্কের এক অনিরসিত অধ্যায় হয়ে থাকবে?
#
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
মোবাইল :০১৭৪০৮৯৮৩৩২(হোয়াটসএ্যাপ)
ই-মেইল: raselahmed1980bk@gmail.com
তারিখ:১৬.০২.২০২৬ খ্রীস্টাব্দ।