, ,

খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালায় শিক্ষার্থী বেদান্ত মন্ডল ঐতিহ্যবাহী ট্রফি শিল্ড উপহার দেয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে খুলনা আর্ট একাডেমির শিক্ষার্থী বেদান্ত মন্ডল। খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালায় একটি মূল্যবান পুরোনো ট্রফি শিল্ড উপহার দিয়ে সে কুড়িয়েছে সবার প্রশংসা ও ভালোবাসা।

বেদান্ত মন্ডল বর্তমানে খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার পাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী।তার পিতা বিকাশ মন্ডল একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পড়াশোনায় যেমন বেদান্তর কৃতিত্ব রয়েছে, তেমনি ছবি আঁকার প্রতিও রয়েছে প্রবল আগ্রহ। চিত্রকলায় দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে সে প্রতিবারই বাড়ি থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে খুলনা আর্ট একাডেমিতে এসে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের কাছে নিয়মিত ছবি আঁকা শেখে।বেদান্তের এই নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ে মুগ্ধ চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস নিজেকে ধন্য মনে করেন। তিনি জানান, বেদান্তের মাতা সোনালী বসু একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা এবং একজন কবি। তাঁর উদ্দেশে তিনি বলেন,“আপনি আপনার সন্তানকে নিয়ে এত দূর পথ অতিক্রম করে এখানে আসেন এটাই আমার দীর্ঘ শিল্পসাধনার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি জানি না আমি কতটা ভালো ছবি আঁকতে পারি, তবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে একটি কথা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি আপনার এই বেদান্ত একদিন এমন আলো ছড়াবে, যে আলোয় আপনার পরিবার, আপনার এলাকা এবং সমাজ সম্মানিত হবে। আমার কাছে যারা শুধু পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিল্পচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে, তাদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, বেদান্তের ক্ষেত্রেও আমার এই বিশ্বাস সত্য হবে।”সম্প্রতি বেদান্ত মন্ডল তার মায়ের কাছ থেকে সংরক্ষিত একটি পুরোনো ট্রফি শিল্ড সংগ্রহ করে খুলনা আর্ট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের হাতে তুলে দেয়।এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন খুলনা শিপইয়ার্ড স্কুল এন্ড কলেজের চারুকারুর শিক্ষক সুব্রত কুমার মন্ডল।
ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সে শিল্ডটি একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালায় উপহার হিসেবে প্রদান করে।এই ট্রফি শিল্ডটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্রীড়া ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ এবং ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে গ্রামের ফুটবল, হা-ডু-ডু (বর্তমান কাবাডি)সহ বিভিন্ন খেলায় বিজয়ী ও রানার্স-আপ দলকে এ ধরনের কাঠের তৈরি ট্রফি শিল্ড প্রদান করা হতো। সে সময় গ্রামবাংলায় এটি অনেকের কাছে “সিল” নামেও পরিচিত ছিল। বর্তমানে এ ধরনের ট্রফি শিল্ড প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাই এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস জানান, ছোটবেলায় তিনি নিজ চোখে এ ধরনের ট্রফি শিল্ডের ব্যবহার দেখেছেন। ২০২২ সালে খুলনা আর্ট একাডেমিতে ঐতিহ্য সংরক্ষণশালা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি এমন একটি শিল্ড সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন। সংগ্রহশালাটি পরিদর্শনের পর বেদান্ত বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং তার মায়ের কাছে সংরক্ষিত শিল্ডটি সংগ্রহ করে উপহার দেয়। এই মূল্যবান উপহার তাকে অত্যন্ত আনন্দিত করেছে।এ সময় তিনি বেদান্তের পিতা-মাতার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন,“আপনারা সন্তানকে শুধু পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত রেখেছেন। এমন মানসিকতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”তিনি আরও বলেন,“আমি বেদান্তর জন্য আন্তরিক আশীর্বাদ করি। আমার বিশ্বাস, একদিন সে তার পিতা-মাতার মুখে হাসি ফোটাবে। শিল্পচর্চা মানুষকে শুধু সৃজনশীলই করে না, বরং একজন মানবিক ও আদর্শ মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলে। সমাজের জন্য সুন্দর কিছু করার অনুপ্রেরণাও শিল্প থেকেই আসে।”তিনি আরও বলেন,“নতুন প্রজন্ম যখন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণে এগিয়ে আসে, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়। বেদান্তর এই মহৎ উদ্যোগ অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”উল্লেখ্য, চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস ২০২২ সাল থেকে নিজের শৈশবের স্মৃতি এবং বাংলার ঐতিহ্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে খুলনা আর্ট একাডেমিতে একটি ঐতিহ্য সংরক্ষণশালা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ধীরে ধীরে সংগ্রহ করতে করতে বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩০০ ধরনের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকের ব্যবহৃত বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র, গ্রামীণ জীবনের নানা উপকরণ, পুরোনো প্রযুক্তিপণ্য, খেলাধুলার স্মারকসহ বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন।২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা আর্ট একাডেমি দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের ছবি আঁকা, সংগীত, আবৃত্তি, হাতের লেখা এবং চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সহায়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে। পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতেও প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, বেদান্ত মন্ডলের মতো সচেতন, সংস্কৃতিমনা ও ঐতিহ্যপ্রেমী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালা ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ হবে। এ ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করবে এবং সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠ ৩ জুলাই তাদের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) প্রকাশ করেছে। এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ করতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস।