, ,

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে চাচা-ভাতিজার বিরোধে প্রাণ গেল তরুণ আলেম জাকারিয়ার 

নিউজটি শেয়ার করুন

খুনিদের ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ঘোষণা পরিবারের

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে পারিবারিক বিরোধের জেরে হামলার শিকার হয়ে দীর্ঘ ২৪ দিন মৃত্যুশয্যায় থেকে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তরুণ আলেম মাওলানা জাকারিয়া আলম।

 মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) দুপুর আনুমানিক ১টার সময় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ লাইফ সাপোর্টে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ​নিহত মাওলানা জাকারিয়া আলম নাগেশ্বরীর বিশিষ্ট আলেম মাওলানা শামছুল হক সাহেবের তৃতীয় ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ই অক্টোবর ২০২৬ (রবিবার) শিশুদের সুপারি গাছের ঢোঙ্গা নিয়ে ঝগড়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে পরিবারের নারীদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে বড়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিন জাকারিয়ার বড় ভাই মাওলানা হাবিবুল্লাহকে একা পেয়ে তাঁর চাচা হযরত আলী ও তাঁর দুই ছেলে মো. তসলিম ও মো. তৈয়াবুর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হাবিবুল্লাহর বাসায় চড়াও হন এবং হুমকি-ধমকিসহ অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।

​ভীত হয়ে মাওলানা হাবিবুল্লাহ তাঁর ছোট দুই ভাই মুফতি ওলিউল্লাহ ও মাওলানা জাকারিয়াকে বিষয়টি মোবাইলে জানান। খবর পেয়ে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে দুই ভাই বাড়িতে আসেন। মাওলানা জাকারিয়া তখন হযরত আলী ও তাঁর দুই ছেলেকে গিয়ে বলেন, “শিশু বাচ্চার কথার ওপর ভিত্তি করে আপনারা আমাদের বাড়িতে এসে বড় ভাই ও ভাবিকে মারার জন্য যেভাবে হুমকি-ধমকি ও গালিগালাজ করছেন, তা কি ঠিক হচ্ছে?”

এ কথা বলা মাত্রই হযরত আলী ও তাঁর দুই ছেলে হত্যার উদ্দেশ্যে মাওলানা জাকারিয়ার মাথায় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সজোরে আঘাত করে। সাথে সাথেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে থাকেন। মাওলানা হাবিবুল্লাহ ও মুফতি ওলিউল্লাহ তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাঁদের ওপরও চড়াও হয় হামলাকারীরা। এ সুযোগে হযরত আলীর পরিবারের নারীরাও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে জাকারিয়ার মাথায়, চোখে ও বুকে আঘাত করতে থাকে। তাঁদের থামাতে গেলে মাওলানা হাবিবুল্লাহর স্ত্রী ও ছোট বোনকেও মারধর করা হয়। এতে জাকারিয়া জ্ঞান হারিয়ে গুরুতর আহত হন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও আহত হন।
​
ঘটনার পর স্বজনেরা দ্রুত আহতদের নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। জাকারিয়ার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে টানা ২৪ দিন আইসিইউ লাইফ সাপোর্টে থাকার পর অবশেষে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

এদিকে দীর্ঘ ২৪ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে মানসিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি পরিবারটি দশ লক্ষাধিক টাকার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত মাওলানা জাকারিয়ার পরিবার অভিযোগ করেছে, ২০১৩ সালেও অভিযুক্ত হযরত আলী ও তাঁর দুই ছেলে কোবাদ আলী নামের একজনকে হত্যা করেছিলেন।

বর্তমান ঘটনায় নাগেশ্বরী থানায় মামলা দায়ের করা হলেও, জাকারিয়া আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থাতেই মামলার কয়েকজন আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, জাকারিয়ার গুরুতর অবস্থা দেখে ঘটনা আড়াল করতে হযরত আলী নিজের স্ত্রীর মাথায় আঘাত করে একটি মিথ্যা চক্রান্তমূলক মামলা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
​
মাওলানা জাকারিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্ত হযরত আলীর বাড়ি ভাঙচুর ও গাছপালার ক্ষতি সাধন করেন। তবে এ ভাঙচুরের ঘটনায় নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়ে জাকারিয়ার পরিবার ও এলাকাবাসী উল্লেখ করেন যে, ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ এলাকাবাসীই এ কাজ করেছেন।

অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে নাগেশ্বরী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. এনামুল হক প্রধান জানান, আসামিরা পলাতক রয়েছে এবং তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা চলছে।
​

মাওলানা জাকারিয়ার অকালমৃত্যুতে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। স্ত্রী হারিয়েছেন তাঁর স্বামীকে, বাবা-মা হারিয়েছেন সন্তানকে এবং ছোট্ট কন্যাশিশুটি হারিয়েছে তার প্রিয় বাবাকে। শিশুটি অবুঝ মনে বারবার বাবাকে খুঁজছে আর কান্না করছে, যা উপস্থিত স্বজনদের হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তুলছে।

​একটি তুচ্ছ পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্বজন ও এলাকাবাসীর একটাই দাবি—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে ফাঁসি নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল।