, ,

কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান রাষ্ট্রদূত মারসানের জাতিসংঘে কিউবার প্রস্তাবের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রত্যাশা

নিউজটি শেয়ার করুন

ভারতে নিযুক্ত কিউবার রাষ্ট্রদূত মহামান্য হুয়ান কার্লোস মারসান কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিউবা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বহিরাগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার দেশটির রয়েছে।

গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর ২০২৬) ভারতের প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ অবসানের প্রস্তাব বিবেচনার আগে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কিউবার রাষ্ট্রদূত বলেন, ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সময় আরও কঠোর হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কিউবায় তেল সরবরাহে বাধা, তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গৌণ নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় কিউবার প্রবেশাধিকার সীমিত করার পদক্ষেপ দেশটির অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

তিনি দাবি করেন, কিউবা একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দেশটিকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি এবং অর্থনৈতিক চাপের ফলে কিউবার জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

বিদ্যুৎ, পানি ও স্বাস্থ্যসেবায় সংকটের অভিযোগ

কিউবার রাষ্ট্রদূত বলেন, অবরোধের প্রভাব দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়ছে। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন এবং যোগাযোগব্যবস্থা নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘে কিউবার দাখিল করা প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, অবরোধের কারণে এক বছরে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৮.০৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান মূল্যে গত ৬৫ বছরে ক্রমপুঞ্জীভূত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৭৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের শেষ নাগাদ পরিকল্পিত সরবরাহের তুলনায় জ্বালানির ঘাটতি দাঁড়ায় ২৬ লাখ ৭০ হাজার টন। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, প্রায় ২০ লাখ মানুষের নিয়মিত পানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং এক লাখ রোগীর অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। অপেক্ষমাণ রোগীদের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশু রয়েছে বলে দাবি করা হয়।

রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেন, এই অবরোধ কেবল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির নীতি নয়; এর মানবিক পরিণতিও অত্যন্ত গুরুতর। তাঁর ভাষায়, জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করার প্রচেষ্টা সফল হবে না। কিউবার জনগণ নিজেদের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সামরিক হুমকি ও আন্তর্জাতিক সংহতির প্রসঙ্গ

সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপসংক্রান্ত বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন মারসান। তিনি বলেন, কিউবা কোনো দেশের জন্য হুমকি নয় এবং দেশটি শান্তি, সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সংহতির নীতিতে বিশ্বাসী।

তিনি গুয়ানতানামোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির সমালোচনা করে সেটিকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান তুলে ধরে কিউবার রাষ্ট্রদূত বলেন, বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশ কিউবার ওপর আরোপিত অবরোধের বিরোধিতা করে আসছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ জুলাই ১৩৬টি দেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি বিশেষ অধিবেশনে এ বিষয়ে আলোচনা করার পক্ষে সমর্থন জানায়। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ৪৩টি দেশ তাদের বক্তব্যে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের প্রচেষ্টা বন্ধের আহ্বান জানায়।

কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মারসান আরও অভিযোগ করেন, জাতিসংঘে কিউবার প্রস্তাবের প্রতি বিভিন্ন দেশের সমর্থন পরিবর্তন করাতে যুক্তরাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করছে। এ অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিক্রিয়া উপস্থাপন করা হয়নি।

সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ওপর গুরুত্ব

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে কিউবার রাষ্ট্রদূত বলেন, কোনো দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি জনগোষ্ঠীকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। কিউবা নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্বাধীন এবং এ ক্ষেত্রে বহিরাগত হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, “আজ কিউবা; আগামীকাল অন্য কোনো দেশও একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারে।”

মারসান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগ্রাসন ও শত্রুতার বিপরীতে সত্য ও ন্যায়বিচার বিজয়ী হবে। তিনি কিউবার ওপর অবরোধ প্রত্যাহারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সমর্থন কামনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কিউবার ওপর দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ, এর অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব এবং জাতিসংঘে আসন্ন প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দেশটির কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা হয়।