বিশেষ প্রতিনিধি: যশোরের শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নে সরকারি সার ডিলারশিপ বরাদ্দকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ লাখ টাকার কথিত আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ উঠেছে। শাখারীপোতা বাজারের মেসার্স জোস্না ট্রেডার্সের মালিক মো. মাসুদ রানাকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথিত পারিবারিক যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়গুলো সামনে আসায় বরাদ্দপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ডিলারশিপ বরাদ্দে আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মাসুদ রানার রাজনৈতিক পরিচয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তাঁদের দাবি, তাঁর পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপির সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক যোগাযোগের কথা প্রচার করতে শুরু করেন। এসব রাজনৈতিক যোগাযোগ সরকারি সার ডিলারশিপ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাসুদ রানা বাহাদুরপুর পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা এবং শাখারীপোতা বাজারে মেসার্স জোস্না ট্রেডার্স পরিচালনা করেন। তাঁর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কথিত পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জামাল, বাহাদুরপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মান্নান মেম্বার, পৌর কমিশনার রাশেদ এবং বেনাপোল পৌর যুবলীগ নেতা রিমনের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রীর জামায়াতের মহিলা তালিম কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পর্কের প্রকৃতি ও ডিলারশিপ বরাদ্দের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
ডিলারশিপ ঘিরে আলোচনার আরেকটি দিক হলো বাহাদুরপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রহমান তিতাসের সঙ্গে মাসুদ রানার কথিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, তাঁদের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে এবং যৌথ ব্যাংক হিসাবও থাকতে পারে। এ ছাড়া তিতাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিশ বা কেবল টিভি ব্যবসাসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম বর্তমানে মাসুদ রানা পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগকারীদের একাংশ দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিতাস আত্মগোপনে চলে যান। এরপর তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেসব কার্যক্রমে কার কী ভূমিকা রয়েছে এবং কথিত যৌথ ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সরকারি সার ডিলারশিপ বরাদ্দকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫ লাখ টাকার কথিত আর্থিক সমঝোতার অভিযোগটি স্থানীয় আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। অভিযোগকারীদের দাবি, স্থানীয় রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক সমঝোতার বিষয়টি ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বরাদ্দের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে এবং আবেদনকারীর যোগ্যতা নির্ধারণে কোন কোন বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি সার ডিলারশিপ কৃষকদের কাছে কৃষি উপকরণ সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় এ ধরনের বরাদ্দে স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত যোগ্যতার যথাযথ প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কথিত আর্থিক সমঝোতার অভিযোগের পাশাপাশি বরাদ্দের প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশাসনিক ভিত্তি পর্যালোচনার দাবি সামনে এসেছে।
বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও উপজেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা এস এম শাখির উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিলারশিপের তালিকা প্রণয়ন ও আবেদনকারীদের বিষয়ে তিনি ইউনিয়ন বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ওই নেতা তাঁকে সবকিছু ঠিক আছে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন বলে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তাঁর জানা ছিল না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এই বক্তব্যের আলোকে ডিলারশিপ বরাদ্দের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব কীভাবে পালন করা হয়েছে, তালিকা প্রণয়নের সময় কোন কোন তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী ছিল—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কর্মকর্তার বক্তব্যটি মাসুদ রানার আবেদন ও চূড়ান্ত বরাদ্দের সঙ্গে সরাসরি কীভাবে সম্পর্কিত, তা নির্দিষ্ট নথি ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, সরকারি সার ডিলারশিপ বরাদ্দের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর যোগ্যতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। বরাদ্দপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সার্বিকভাবে বাহাদুরপুর ইউনিয়নে সরকারি সার ডিলারশিপ বরাদ্দকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আবেদনকারীর যোগ্যতা যাচাই, রাজনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাব্য প্রভাব, কথিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং প্রায় ১৫ লাখ টাকার আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ। এসব বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করতে আবেদনপত্র, যোগ্যতা যাচাইয়ের নথি, বরাদ্দের তালিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও ব্যবসায়িক তথ্য পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি সার ডিলারশিপ বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে।






