শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করে তোলেন শিক্ষক। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিক্ষকের হাতে।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি একজন শিক্ষক গড়ে তোলেন মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত নতুন প্রজন্ম। তাই শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা, সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঠিক এমনই একটি দীর্ঘদিনের দাবি নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেজেট থেকে বাদপড়া প্রধান শিক্ষকরা। তাদের দাবি, জাতীয়করণের আগে বৈধভাবে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তী সময় অনেককেই সহকারী শিক্ষক হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। ফলে পদমর্যাদা, চাকরিগত সুবিধা ও পেশাগত স্বীকৃতির ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক গেজেট থেকে বাদপড়া প্রধান শিক্ষক ঐক্যজোট দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি প্রদান, মতবিনিময় সভা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদনসহ নানা গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে তারা বিষয়টির সমাধান চেয়েছেন। তাদের মতে, শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত হলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে।
বাংলাদেশ নব জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি দেশের ২৬ হাজার ১৯৩ টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কর্মরত ১৮ ৭৭২ জন শিক্ষকের চাকুরী জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু বড়ই দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি আদেশক্রমে জারিকৃত গেজেট,প্রজ্ঞাপন ও নীতিমালা এবং পরিপত্রে সেই সময় কর্মরত প্রধান শিক্ষকদের’ প্রধান শিক্ষক’ পদে গেজেট, প্রদানের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও জাতীয়করণকৃত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ১ম ধাপের২১, ১৯২জন প্রধান শিক্ষক গেজেট প্রাপ্ত হয়। বাকি ১ম ধাপের অবশিষ্ট কমিউনিটি বিদ্যালয় ও রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়, ২য় ধাপের -২২৫২টি বিদ্যালয়, ৩য় ধাপের -৯৬০টি বিদ্যালোয়, মোট ৫০০১জন শিক্ষক গেজেটের প্রাক্কালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান শিক্ষক পদ চেয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। ৯ জানুয়ারি২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও সকল গেজেট, প্রজ্ঞাপনে নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও ২০১৩ সাল হইতে আমরা প্রায় ৫০০১জন শিক্ষক বৈষম্য ের শিকার হয়ে ২০১৭ সালে আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায় হাইকোর্ট প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করি।
বাংলাদেশ নব জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি কামাল উদ্দিন এর নেতৃত্বে মানববন্ধন, ও বিভিন্ন দপ্তরে মন্ত্রী আমলাদের সাথে, একাধিকবার বৈঠক করেছেন বাদ পড়া প্রধান শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে গেজেটভুক্ত করনের প্রসঙ্গে, তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাদের এই আন্দোলন বাস্তবায়নের জন্য।
“একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্য বই য়ের পাঠ দেন না; তিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগ র। সীমিত বেতন, অনিশ্চিত চাকরি, পারিবারিক দায়িত্ব ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অসংখ্য শিক্ষক বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজ ন্মকে গড়ে তুলেছেন।
অনেকেই নিজের সন্তানের চাহিদা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিবেদিত থেকেছেন। ঐক্যজোটের নেতাদের দাবি, এমন হাজারো শিক্ষক দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আজও তারা তাদের প্রাপ্য পদমর্যাদার স্বীকৃতির অপেক্ষায়। তাদের বক্তব্য, এটি কেবল চাকরির পদ নয়, বরং দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদান, অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের যথাযথ মূল্যায়নের প্রশ্ন। অন্যদিকে বিষয়টি বর্তমানে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পৃক্ত। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আদালতের প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা আশা করছেন, দীর্ঘদিনের এই জটিলতার একটি ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই সমাধান হবে, যেখানে যোগ্যতা, পূর্ব দায়িত্ব ও অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি মিলবে। তাদের মতে, শিক্ষার ভিত শক্ত করতে শিক্ষকদের সম্মান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কল্যাণকর হবে। এদিকে, বিষয়টি যেহেতু বর্তমানে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই এ বিষয়ে চূড়ান্ত দিক-নির্দেশনা
দেবে বলে শিক্ষকেরা আশা করছেন।
অনেক শিক্ষক জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা ও পদক পেয়েছেন, যা তাঁদের যোগ্যতা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতি। সংগঠনের দাবি, এই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিয়ে তাঁদেরকে পূর্বের দায়িত্ব অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদে গেজেটভুক্ত করা ন্যায্য সমাধান হতে পারে। তাঁদের বিশ্বাস, এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শিক্ষকদের মর্যাদা ও পেশাগত সম্মান নিশ্চিত করবে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ও আইনি বাস্তবতা— তিনটি দিকই সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও আদালতের দিকনির্দেশনার মাধ্যমে একটি ন্যায্য সমাধানই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রত্যাশা।







