, ,

গণভোট,বাংলাদেশে গণভোটের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

নিউজটি শেয়ার করুন

                                                                              গণভোট কি?
গণভোট বা জনমত জরিপ হলো এমন প্রক্রিয়া যেখানে জনগণ সরাসরি কোনো প্রস্তাব, আইন বা রাজনৈতিক বিষয়ে ভোট দেয়। এটি আইনত বাধ্যতামূলক বা পরামর্শমূলক হতে পারে। ষোড়শ শতকে সুইস ক্যান্টন গ্রাউবুনডেনে এর উৎপত্তি ঘটে। বিশ শতকের মাঝামাঝি ব্যবহার কমলেও ১৯৭০-এর দশক থেকে পুনরায় জনপ্রিয়তা পায়। ডেভিড অল্টম্যান গণভোটকে চারভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন—বাধ্যতামূলক বনাম ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক বনাম পরামর্শমূলক, নাগরিক বনাম কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ, এবং সক্রিয় বনাম প্রতিক্রিয়াশীল। বাধ্যতামূলক গণভোটে নির্দিষ্ট সরকারি পদক্ষেপের আগে ভোট আবশ্যক, আর ঐচ্ছিক গণভোট দাবি বা স্বাক্ষর সংগ্রহের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গণভোট
যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণভোট বা রেফারেন্ডাম একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক বা শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। সাধারণত যে দেশের গণতন্ত্র যত উন্নত, সেখানে গণভোটের সংখ্যা তত বেশি। যেমন ১৮৪৮ সালে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুইজারল্যান্ডে ছয় শতাধিক গণভোট হয়েছে। গণভোটের সংখ্যা ইতালিতে ৭২. অস্ট্রেলিয়ায় ৪৫, আয়ারল্যান্ডে ৩৫. যুক্তরাজ্যে ১৩। আবার, অসাধারণত, জাপান বা ভারতের মতো দেশে কখনোই গণভোট হয়নি।

বাংলাদেশে গণভোটের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের আদি অর্থাৎ বাহাত্তরের সংবিধানে গণভোটের বিধান ছিল না। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান প্রথম গণভোটের আয়োজন করেন। এজন্য ওই বছরের ২ মে তিনি সামরিক আইন আদেশ জারি করেন – যা সাংবিধানিক বৈধতা পায় ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর সময়। ওই সংশোধনীতে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোট সম্পর্কিত (১খ), (১গ) এবং (১ঘ) বিধান যুক্ত করা হয়। ১৯৯১ সালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদের (১ক) সংশোধন করে ৫৮, ৮০ ও ৯০ক অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়। অর্থাৎ দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আরও সীমিত আকারে সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮ বা ৫৬ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালের ৩০ জুন তারিখে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে গণভোটের বিধান পুরোপুরি বাতিল করা হয়। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পরে গত ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মামলায় ১৪২ ধারা বাতিল ঘোষণা করে আদালত গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। যদিও আদালতের রায়ে গণভোটের বিধানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কেননা, জেনারেল ক্লজ অ্যাক্ট ১৮৯৭-এর ৬ ধারা অনুযায়ী কোনো আইনকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সংসদে বিলটি পাস করাতে হয়। (নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট হয়েছে। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে। ১৯৮৫ সালের এরশাদের আমলে এবং সর্বশেষ ১৯৯১ সালে।

প্রথম গণভোট
প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুসৃত নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি মানুষের আস্থা আছে কি না – এই প্রশ্নে। মূলত নিজের পদকে বৈধ করার জন্য জিয়াউর রহমান এই গণভোটের আয়োজন করেন। অফিসিয়ালি এই হ্যাঁ না বা গণভোটে অংশ নেন ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৮ জন ভোটার। এরমধ্যে হ্যাঁ ভোট পড়ে ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৮৭০টি। তার মানে প্রদত্ত ভোটের ৯৮.৮৮ শতাংই জিয়াউর রহমানের আস্থা রাখেন। বাকি ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮টি ভোট পড়ে ‘না’ বাক্সে। জিয়াউর রহমান ওই সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন এ কথা সত্য। কিন্তু ৯৯ শতাংশ ভোট পাওয়ার মতো জনপ্রিয় ছিলেন কি না, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।

দ্বিতীয় গণভোট
দ্বিতীয় গণভোট হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আস্থা এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকায় জনগণের সম্মতি আছে কি না – এই প্রশ্নে। এরশাদও নিজের ক্ষমতার বৈধতা দেওয়ার জন্য এই গণভোটের আয়োজন করেন এবং স্বভাবতই ভোটের ফলাফল তার পক্ষেই যায়। সরকারি হিসাবে এই গণভোটে ভোট পড়ে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার ৯৬৪টি। এর মধ্যে ৩ কোটি ২৬ লাখ ৬১ হাজার ২৩৩ অর্থাৎ ৯৪.১১ শতাংশ ভোটার এরশাদের পক্ষে ভোট দেন। বাকি ৫.৫০ শতাংশ ভোট পড়ে ‘না’ বাক্সে।

গবেষকরা বলেছেন, গণভোটের দিন নির্বাচন কেন্দ্রগুলো ছিল শূন্য। জনগণের উপস্থিতি একেবারেই ছিল না। কিন্তু ভোটের বাক্স ব্যালটে ভরে যায়। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরে এরশাদ স্বগর্বে ঘোষণা করেন, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ম্যান্ডেট দিয়েছে।

তৃতীয় গণভোট:
বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় তথা সবশেষ গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেওয়া উচিত কি না – এই প্রশ্নে। প্রথম দুটি গণভোটের সঙ্গে তৃতীয় গণভোটের মৌলিক পার্থক্য ছিল এই যে, এই ভোট রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষমতায় টিকে থাকার বৈধতার জন্য নয়, বরং এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য। সরকারি হিসাবে এই ভোটে ৬ কোটি ২২ লাখ ৪ হাজার ১১৮টি ভোট পড়ে হ্যাঁ বাক্সে – যা প্রদত্ত ভোটের ৮৪.৩৮ শতাংশ। যদিও বেসরকারি হিসাবে বা গবেষকদের লেখায় এই ভোটের সংখ্যা আরও অনেক কম।

২০২৬ এর গণভোট
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষনা করেছেন। ওই ভাষণে জানানো হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন কমিশন সে লক্ষ্যে ভোট গ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করে। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধান সংশ্লিষ্ট। তবে এসব প্রস্তাবের একটি বড় অংশে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত ও আপত্তি ছিল, যা নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দুটি আইনগত দলিল জারি করেছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এখানেই প্রথম বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।

সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর সংজ্ঞায় আদেশ শব্দটি থাকলেও রাষ্ট্রপতির স্বতন্ত্র আইনগত আদেশ জারির কোনো বিধান সংবিধানে নেই। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের অনুপস্থিতিতে কেবল অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। সে বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গণভোটের ঘোষণা সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলেই মনে হয়। এরপর আসে গণভোটের প্রশ্ন কাঠামোর বিষয়টি। সরকার সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবকে একত্র করে একটি ‘হাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্ন তৈরি করেছে, যার ভেতরে রয়েছে চারটি বড় উপ-প্রশ্ন। বাস্তবে এর অর্থ হলো, ভোটার যদি চারটির মধ্যে এক বা একাধিক প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষন করেন, তবুও তাকে একটি সামগ্রিক উত্তরের দিকে যেতে বাধ্য করা হবে। এতে নাগরিকের স্বতন্ত্র মতামতের প্রকাশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

চলতি আলোচনায় ইতিপূর্বে বর্ণিত বাংলাদেশের ইতিহাসেও গণভোটের অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক নয়।
১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালের গণভোটগুলোতে কাগজে-কলমে বিপুল ভোট পড়ার দাবি থাকলেও গবেষনা ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তবে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত এবং ফলাফল ছিল ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাশানুযায়ী। অর্থাৎ গণভোট বারবারই রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে কি হবে?
চলুন জেনেনিই গণভোটে যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে কী হবে? এই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক কৌতূহল নয়; এটি ২০২৪ এর পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন। যদি অন্তর্বর্তী সরকার সত্যিই গণভোটকে একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করে থাকে, তাহলে ‘না’ জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকেও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ধরে নিয়ে আগেই একটি বিকল্প রোডম্যাপ প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল-যেখানে বলা হত, ‘না’ জিতলে পরবর্তী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে। কিন্তু যদি বাস্তবে সরকার ‘হ্যাঁ’‑কেই একমাত্র সম্ভাব্য ফলাফল ধরে নিয়ে অগ্রসর হয়, এবং ‘না’‑র সম্ভাবনাকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বা অচিন্তনীয় ধরে নেয়, তাহলে গণভোটের পুরো প্রক্রিয়াই ‘প্রতীকী বৈধতা অর্জনের প্রচেষ্টায়’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কি হবে?
এবার গণভোটের ‘হ্যাঁ’ সম্পর্কে একটু বিশদভাবে ও
বাস্তবতার নিরিখে আলোচনায় আসা যাক। প্রথমেই বলতে হয়, এবার কেউ ভোট দিতে না গেলেও ‘হ্যাঁ’ জয়ী হবে,এটা রাজনীতি মনষ্ক সকলেই জানেন। এটাও জানেন, এ দেশে ইতিহাসে কখনও ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হয়নি। হয়ও না। কারণ ‘না’ জেতানোর জন্য গণভোট আয়োজন করা হয় না। তাহলে প্রশ্ন হলো-এই নিশ্চিত জয়ের পরও কেন বিএনপিসহ বড় দলগুলোকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে হচ্ছে?

এটাই এই রাজনৈতিক মুহূর্তের সবচেয়ে বড় আইরনি। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এখন ক্ষমতার কাছাকাছি এসে স্টাবলিশমেন্ট যেন সামান্যতম রুষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে সবাই অতি সতর্ক। রাজনৈতিক দলগুলো বুঝে গেছে এই মুহূর্তে ‘না’ বলা মানেই ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ করা।
এখন প্রশ্নটা হলো,গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়,তাহলে কী ঘটতে পারে? বড় ধরনের কোনো ব্যতিক্রম না ঘটলে কয়েকটি সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশ-বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রদত্ত মতামতের প্রেক্ষিতে কতিপয় সম্ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রথমত, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়নের নামে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তথাকথিত ‘ঐকমত্যের সরকার’ গঠন করা হবে। এই কাঠামোর মধ্য দিয়েই সংবিধানের প্রায় ৪৬টি সংশোধনী পাশ করানোর পথ তৈরি হবে। এই উদ্দেশ্যে গঠিত হবে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ, যারা ২৭০ দিনের মধ্যে পুরো সংবিধান পুনর্লিখনের দায়িত্ব পাবে।

দ্বিতীয়ত, এই পরিষদের সদস্য হবেন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই। অর্থাৎ তারা একাধারে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করবেন।

তৃতীয়ত, নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হবে না। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এর ১০(১) ও ১০(২) ধারার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্নধরনের এক সংসদ কাঠামো কার্যকর হবে, যেখানে সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কার্যত থাকবেনা, যতদিন না সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে।

চতুর্থত, এই সংস্কার প্রক্রিয়ার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ৯ মাস বা ২৭০ দিন। কিন্তু বাস্তবায়ন আদেশের ৮(ঙ) ধারা অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও সংবিধান সংস্কার বিল গৃহীত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে এবং তা আইন হিসেবে কার্যকর হবে কোনো সংসদীয় ভোট ছাড়াই।

এখানে বিষয়টি স্পষ্ট যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ফলাফলকে ভিত্তি করে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে এবং ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও ৯ মাস বেড়ে যাবে।

অনেকের ধারনা মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচিত সরকারের হাতে জুলাই সনদ ছেড়ে দেবে, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। কারণ রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ একটি অস্থায়ী আইন; সংসদ তা পাশ না করলে বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সকল দিনের কর্মকাণ্ডের বৈধতা দানের ক্ষমতা তারা অন্য কারও হাতে ছাড়তে চাইবে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, নির্বাচনের পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত হলে বা তারা নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা না ছাড়লে জনগণ মানবে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণের বক্তব্য- জনগণের না মেনে উপায় নেই কারণ, নির্বাচনে জিতবে কোনো একটা পক্ষ- হয় বিএনপি না হয় জামায়াত-এনসিপি জোট। যারা হারবে সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরে তারা আগ্রহ দেখাবে না। সরকারও জানে এই মুহূর্তে দেশের কোন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা নেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার। ফলে এখানে গণভোটের ফলাফলের আলোকে বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’ জিতলে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের নামে আরও ৯/১০ মাস দেশ শাসনের সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না।

বিশ্লেষকগণ যুক্তি দেখান যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আর্শীবাদপুষ্ট কোলাবরেটররা যাদের বিরুদ্ধে সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদ আঁকড়ে কোটি কোটি টাকা লুঠপাট ও দূর্নীতি, চরম ক্ষমতার অপব্যহার, ইত্যাদি প্রমাণিত বা সন্দেহজনক অভিযোগ ইতিমধ্যে উঠেছে, তাদের মধ্যে অন্তত কিছুটা হলেও ভয়ের ছায়া পরিলক্ষিত হতো। এমন শঙ্কিত কি কাউকে দেখা যাচ্ছে? একদমই না।

আর জিতে যাওয়া পক্ষ? তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য হিসেবে বিবিধ সুবিধা ভোগের কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধিতে বাগড়া দেবে না।

বস্তুত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নামে যে আদেশ প্রণীত হয়েছে, তাতে কোন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল না। এটা ছিল সরকারের একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত। মনে করে দেখুন, গত বছরের অক্টোবরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর অঙ্গীকারনামায় সই হয়ে যাওয়ার পর এনসিপি এর আইনি ভিত্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। জামায়াতও এতে সায় দিয়েছিল। বিএনপি বলেছিল, নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। এনসিপি বাগড়া দিয়েছিল। এরপর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে সাত দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছিল। কোনোও দল সেক্ষেত্রে এগিয়ে না-আসার পর সরকার ১৩ নভেম্বর বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। এনসিপি-জামায়াত ও তাদের শরিকরা বাদে অধিকাংশের মতামত ছিল এটা সরকারের একতরফা সিদ্ধান্ত। বিএনপি এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেছে, কিন্তু তাতে সরকারের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়নি।

এমতাবস্থায় সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সবকিছু সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া দল বা জোট দিয়ে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন এবং নিজে তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর প্রেসিডেন্সিয়াল পাওয়ার প্রয়োগ করে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে যাতে করে শাসন ব্যবস্থা সংসদীয়ও মনে হবে আবার প্রেসিডেন্সিয়ালও মনে হবে।

অনেকের মতে,এই পরিকল্পনা নিয়েই ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সরকার এগোচ্ছে। তাই তাদের কপালে কোনও চিন্তার ভাঁজ নেই। তারা মার্চে জাপান সফরের সিলসিলাও করতে পারছেন। নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বড় বড় চুক্তি সই করছেন।

জাতীয় নির্বাচন মাত্র এক সপ্তাহ দূরে থাকলেও
অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও নীতিগতভাবে একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এসবের মধ্যে বন্দর, বিমান, জ্বালানি, প্রশাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা, প্রায় সব খাতে ব্যয় নির্ধারণ ও দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি রয়েছে।

বিশদভাবে বলতে গেলে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি, ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে লালদিয়া টার্মিনাল নিয়ে এপিএম টার্মিনালসের ৩৩ বছরের চুক্তি এবং পানগাঁও নদীবন্দর পরিচালনায় মেডলগের ২২ বছরের চুক্তি, বিমান খাতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিসহ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।একই সময়ে ২০২৬ সালে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে নবম বেতন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
পাশাপাশি একনেক ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকার ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রূপপুর প্রকল্পেই ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা।
এছাড়াও প্রশাসনিকভাবে ১১৮ জন ঊর্ধ্বতন আমলার পদোন্নতি, র‍্যাবের জন্য ১৬৩টি যানবাহন ক্রয় এবং ২৫২টি নতুন রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এতে ধারনা করা যায়, আগামীর নির্বাচিত সরকারও ড.মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই গঠিত হতে পারে বা তার অংশীদারিত্বের বিষয়টি প্রায় সুনিশ্চিত।

এ কারনেই জামায়াত-এনসিপি’র পাশাপাশি দেরীতে হলেও বিএনপি ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার জন্য প্রচার চালাতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য ভোটে জিতলেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় একক কোনও রাজনৈতিক শক্তির বসার সম্ভাবনা ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

তবে অনেকের মতে এই বাস্তবতায় গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’শুধু একটি ভোট নয়,এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস ও রাজনীতির শক্তিশালী এক নির্ণায়ক।

লেখক: রাসেল আহমদ
সাংবাদিক ও কলাম লেখক