, ,

খাল দখলমুক্তকরণে সক্রিয়তার জেরেই বদলি, নাকি টেন্ডারের দায়? নারায়ণগঞ্জ পাউবো প্রকৌশলীর ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার

নিউজটি শেয়ার করুন

নারায়ণগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহম্মেদকে সম্প্রতি বদলি করা হয়েছে। খাল ও জলাশয় পরিষ্কারের ১৩টি প্যাকেজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হলেও সংশ্লিষ্ট নথি ও সূত্র বলছে, তিনি মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ছিলেন না এবং ঠিকাদার নির্বাচনও তার একক সিদ্ধান্তে হয়নি। বরং দায়িত্বকালে অবৈধ দখল উচ্ছেদে তার সক্রিয় ভূমিকার কারণে প্রভাবশালী মহল ক্ষুব্ধ হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে বদলির মুখে ফেলেছে, এমন ধারণাই এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জে খাল-জলাশয় পরিষ্কারের জন্য ১৩টি প্যাকেজে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তালিকাভুক্ত ৫৯টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০টি ইজিপির এলটিএম প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। যাচাই-বাছাই শেষে ২৩টি প্রতিষ্ঠান রেসপনসিভ ঘোষিত হয়। এর মধ্যে আফজাল অ্যান্ড ব্রাদার্স ও সর্দার এন্টারপ্রাইজ চারটি করে প্যাকেজ পায়। বাকিগুলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে যায়। মূল্যায়ন কমিটিতে তিনজন কর্মকর্তা ছিলেন। নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ আহম্মেদ সেই কমিটির সদস্য ছিলেন না। কমিটিই কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে রেসপনসিভ ঘোষণা দেয় এবং ইজিপির মাধ্যমে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।

বিল পরিশোধ প্রক্রিয়াতেও তার একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। ফলে মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ার বাইরে তাকে দায়ী করে বদলির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, সিদ্ধান্ত ও নথিতে ভূমিকা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হয়। কমিটিতে না থাকা এবং নথিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকলে শুধু পদমর্যাদার কারণে দায়ী করা যৌক্তিক কি না, সেটা প্রশ্নের বিষয়। পুরো বিষয় নির্ভর করে নথি, অনুমোদনের ধাপ ও দায়িত্ব বণ্টনের ওপর।

অন্যদিকে, শুভ আহম্মেদ দায়িত্বকালে খাল ও জলাশয় দখলমুক্তকরণে সক্রিয় ছিলেন। গত জুন-জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচির আওতায় নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩০ একরের বেশি খাস জমি উদ্ধার করা হয়। কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ নোটিশও দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মনে করছে, এসব কার্যক্রমে প্রভাবশালী মহল ক্ষুব্ধ হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও তাকে জড়িয়ে বদলি করা হয়েছে।

শুভ আহম্মেদ নিজে বলেন, “যে প্রক্রিয়ার কোথাও আমি নেই বা ছিলাম না, সেখানে আমাকে ট্যাগ করা হচ্ছে। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটিতে আমি ছিলাম না। কমিটিই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেসপনসিভ করেছে এবং কাজ দিয়েছে। আমার একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল না।” তিনি আরও বলেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে একের পর এক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সরকারি জমি ও জলাশয় উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছি। এতে একটি সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্য একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করছে।

সরেজমিনে ১৩টি প্যাকেজের আওতায় প্রায় ৫ কিলোমিটার খাল ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি খালই এখন পরিষ্কার। পরিষ্কারের আগের ও পরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাঁশের বেড়া দিয়ে টেকসই সমাধানের চেষ্টাও করা হয়েছে।

একই সময়ে দুদক তার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। অভিযোগ, তার বাবা মামুনুর রশীদের ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে একাধিক সরকারি কাজ নেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম হয়েছে। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নে একটি সেচ প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন করেছে। নথি অনুসারে, ওই জোনে তার বাবার নামে অন্তত সাতটি কাজ হয়েছে এবং প্রায় ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিকট আত্মীয় ঠিকাদারি কাজ করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। অনুসন্ধানে টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল উত্তোলন, কাজের মান ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, নথিতে স্বাক্ষর ও আর্থিক সম্পৃক্ততা পৃথকভাবে যাচাই করা উচিত। তা না হলে প্রকৃত দায় নির্ধারণের বদলে একজনকে দায়ী করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। নারায়ণগঞ্জের খাল দখলমুক্তকরণ ও পরিষ্কার কার্যক্রমের সফলতা স্পষ্ট হলেও প্রকৌশলীর বদলি ও দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে, এটি কি সত্যিকারের জবাবদিহির অংশ, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহারের ফল?