“সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কালজয়ী উপন্যাস ‘লালসালু’ বাংলা সাহিত্যের এক নির্মম আয়না। যে আয়নায় আমরা দেখি গ্রামীণ সমাজের অন্ধকার, কুসংস্কারের শেকড়, আর ধর্মকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা শোষণের এক ভয়ংকর অর্থনীতি। মজিদ নামের এক ধুরন্ধর, ভূমিহীন মানুষ কীভাবে ধর্মের লেবাস পরে মহব্বতনগরের মতো এক অজপাড়া গাঁয়ে ‘লালসালু’র আড়ালে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, তা আমরা পড়েছি। মাজার নেই, পীর নেই, তবু লাল কাপড়ে ঢাকা এক ঢিবিকে কেন্দ্র করে ভয়, ভক্তি আর অন্ধবিশ্বাসের ব্যবসা চলে। খালেক ব্যাপারীর মতো সমাজপতিরা নীরব সমর্থন দেয়, কারণ মজিদের টিকে থাকাই তাদের টিকে থাকা। স্কুল হলে মানুষ শিক্ষিত হবে, প্রশ্ন করবে — তাই মজিদ শিক্ষার বিরোধী। আকালু-হাসুর মতো যারা সত্য বোঝে, তারা কোণঠাসা।”
‘লালসালু’ কেবল ১৯৪৮ সালের মহব্বতনগরের গল্প নয়। এটা ২০২৬ সালের বাংলাদেশের শত শত মাজারের গল্প। যেখানে মাজার আছে, পীর আছে, কিন্তু ‘মজিদ’রা নেই তা নয়। বরং ‘খাদেম’ নামের স্বার্থান্বেষী একদল মানুষ মাজারকে আয়ের সবচেয়ে সহজ পথ বানিয়ে নিয়েছে। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগ, ভক্তি আর মান্নতের টাকায় গড়ে উঠেছে কোটি টাকার ধর্মব্যবসা। কোনো হিসাব নেই, জবাবদিহি নেই, স্বচ্ছতা নেই। আছে কেবল লালসালুর মতো এক পবিত্র আবরণ, যার আড়ালে চলে অন্ধকারের কারবার।
এই অন্ধকারে হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দিয়েছিলেন সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন — মাজারের বাক্সে, ডেগে, গিলাফে, গদিতে প্রতিদিন কত টাকা পড়ে। আর সেই টাকা কোথায় যায়।
ডিসি সারওয়ার আলম যখন বুঝলেন তাঁকে সিলেট থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি নীরবে চলে যাননি। যাওয়ার আগে তিনি হযরত শাহজালাল রহ.-এর মাজারের কথিত খাদেম ও তাদের দোসরদের মুখে চুনকালি মেখে গেলেন। কীভাবে?
তিনি মাত্র তিন দিনের — শনি, রবি ও সোমবারের — দানের টাকার হিসাব প্রকাশ্যে গণনা করে জনসম্মুখে পেশ করলেন। হিসাবে এলো ১৭ লক্ষ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা ৭ আনা নগদ, সাথে স্বর্ণ ও ২টি সৌদি রিয়াল। মনে রাখতে হবে, এটা সপ্তাহের সবচেয়ে কম আয়ের তিন দিনের হিসাব। বৃহস্পতি ও শুক্রবারে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে, সবচেয়ে বেশি টাকা ওঠে।
এখানেই শেষ নয়। তিনি দেখালেন, সবচেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যায় মাজারের গিলাফের উপর। ভক্তরা গোলাপজল দিয়ে ভেজানো গিলাফে প্রতিদিন আনুমানিক ৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকা দিয়ে যায়। গম্বুজের নিচে যে গদি আছে, সেখানে প্রতিদিন পড়ে প্রায় তিন লাখ টাকা। অফিসে কথিত রিসিটের মাধ্যমে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগির মান্নতের হিসাব তো এই তিন দিনের গণনায় আসেইনি। তাঁর অনুমান, সব মিলিয়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয় হয় শুধু এই মাজারে। আর এই টাকার সিংহভাগ, প্রায় ৭০%, লুটে নেয় কথিত খাদেমচক্র। দানবাক্সে যা পড়ে, তা মাত্র ৩০%।
এই হিসাব ‘লালসালু’র মজিদের আয়ের হিসাবের চেয়েও ভয়াবহ। মজিদ তবু একা ছিল। এখানে একটি সিন্ডিকেট, একটি চক্র। মজিদ মানুষকে ভয় দেখিয়ে আদায় করত। এখানে মানুষ স্বেচ্ছায় ভক্তিতে দেয়, কিন্তু সেই ভক্তির টাকা যায় ভণ্ডদের পেটে।
হযরত শাহজালাল রহ.-এর মাজার ৭০০ বছরের পুরনো। এই সাতশ বছর ধরে একটা রীতি চলে আসছিল — মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব জনগণ জানবে না। খাদেমরা যা বলবে, তাই সত্য। ডেগের টাকা, বাক্সের টাকা তারা নিজেরাই গণনা করে নিজেরাই ভাগ করে নেবে।
ডিসি সারওয়ার আলম বিদায়ের আগে এই ৭০০ বছরের অচলায়তন ভেঙে দিলেন। তিনি গত বৃহস্পতিবার মাজারের ৩টি ডেগে সিলগালা করেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজস্ব দানবাক্স বসান। উদ্দেশ্য একটাই — মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা।
সোমবার, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, শাহজালাল মাজারের টাকা প্রকাশ্যে গণনা হলো। শত শত মানুষ দেখল, চারদিনে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা উঠেছে। প্রশ্ন জাগল — এতদিন এই টাকা কোথায় যেত? কারা খেত?
এই প্রশ্নটাই ‘লালসালু’র আকালুরা করতে পারেনি। আকালু বুঝেছিল মজিদ ভণ্ড, কিন্তু সমাজপতিদের ভয়ে চুপ ছিল। সারওয়ার আলম সেই সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রশ্নটা তুললেন, এবং উত্তরও দিলেন।
সারওয়ার আলম ঘোষণা দিয়েছিলেন — মাজারের মান্নত ও দান-খয়রাতের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় হবে। কথিত খাদেমদের পেট থেকে মান্নত রক্ষা করা হবে। তিনি একটি সমন্বিত ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন — খাদেম ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে আয় পরিচালনা করবে, এবং টাকা গণনা হবে প্রকাশ্যে।
এই প্রস্তাবে ‘বিত্তশালী মিসকিনরা’ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। কারা এই মিসকিন? এরা সেই খাদেম, যারা মাজারের নামে কোটি টাকার মালিক, গাড়ি-বাড়ি করেছে, অথচ নিজেদের দরবেশ বলে দাবি করে। এদের স্বার্থে আঘাত লাগতেই শুরু হলো বহুমুখী ষড়যন্ত্র।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বিদেশ সফরের সুযোগে ডিসি সারওয়ারকে প্রত্যাহার করা হলো। এটা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও, জনগণ বুঝেছে — এটা ‘লালসালু’র মজিদকে রক্ষা করতে খালেক ব্যাপারীর চাল।
মজিদের বিরুদ্ধে যখন আক্কাসের দল দাঁড়িয়েছিল, খালেক ব্যাপারী কৌশলে মজিদকেই বাঁচিয়েছিল। এখানেও তাই হলো। খাদেমচক্র তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে সারওয়ারকে সরিয়ে দিল।
ডিসি সারওয়ারের বদলি নিয়ে সিলেটে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। রবি ও সোমবার বিক্ষোভ হয়। জনগণ বুঝে গেছে, কেউ একজন তাদের হয়ে লড়েছিল।
বুধবার দেশে ফিরে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বললেন, “উনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। আমরা সেদিকেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করব।”
তিনি স্পষ্ট করে বললেন, “এ ধরণের স্বচ্ছতার পদক্ষেপে আমাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব এবং আমরা সবাইকে নিয়ে মাজারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করব। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
মন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রমাণ করে, সারওয়ার আলম একা ছিলেন না। তিনি একটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে ধাক্কা দিয়েছিলেন, এবং সেই ধাক্কায় সরকারের উপরের মহলও নড়ে বসেছে। ‘লালসালু’র মহব্বতনগরে মজিদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলেনি। কিন্তু সিলেটে জনগণ কথা বলেছে, মন্ত্রী কথা বলেছেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ দেখিয়েছিলেন, মজিদ কীভাবে ধর্মীয় ভীতি তৈরি করে। “এখানে পীরের মাজার, অবহেলা করলে বিপদ” — এই ভয়ে মানুষ টাকা দিত। আজকের খাদেমরা ভয় দেখায় না, তারা ‘বরকত’ আর ‘নেকি’র লোভ দেখায়। “গিলাফে টাকা দিলে মনের বাসনা পূরণ হয়”, “গদিতে টাকা দিলে রোগ মুক্তি” — এই প্রচারণা চালিয়ে তারা কোটি টাকা তুলছে।
মজিদ স্কুলের বিরোধিতা করেছিল, কারণ শিক্ষা তার ধর্মব্যবসার শত্রু। আজকের খাদেমরা স্বচ্ছতার বিরোধিতা করে, কারণ হিসাব দিলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হবে। মজিদ রহিমার মতো সরল নারীকে বিয়ে করে সমাজে শেকড় গেড়েছিল। আজকের খাদেমরা ‘সেবক’ সেজে, দরবেশের লেবাস পরে রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় শেকড় গেড়েছে।
তফাৎ একটাই — মজিদের ছিল একটা ঢিবি, আর এদের আছে সোনার গিলাফ, শ্বেতপাথরের গম্বুজ। মজিদের আয় ছিল কয়েক সের চাল, আর এদের আয় প্রতিদিন ২০-২৫ লাখ টাকা।
বিদায়ের আগে সারওয়ার আলম মাজারের বাক্স ও ডেগের টাকা জনসম্মুখে গণনা শেষে জেলা প্রশাসন থেকে আরও পাঁচ লক্ষ টাকা যোগ করে ব্যাংকে রেখে গেছেন। তিনি একটা বার্তা দিয়ে গেছেন — “ডিসি সারওয়ার প্রত্যাহার হয়েছেন, কিন্তু তাঁর স্বচ্ছতার নীতি সিলেটবাসীর নিকট আমানত।”
এই আমানত রক্ষার দায় এখন সিলেটবাসীর, রাজনৈতিক নেতাদের, এবং সরকারের। মন্ত্রী আরিফুল হক কথা দিয়েছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। এখন দেখার পালা, সিলেটের রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে কাজ করবে, না জনদাবির প্রতি লক্ষ্য রাখবে?
‘লালসালু’ উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত মজিদই জিতেছিল। আকালু হেরে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবের সিলেটে গল্পটা অন্যরকম হতে পারে। কারণ এখানে একজন সারওয়ার আলম ‘আকালু’ হয়ে নয়, ‘ডিসি’ হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর থেকে আঘাত করেছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, চাইলে প্রশাসন পারে। চাইলে সিস্টেম ভাঙা যায়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘লালসালু’ লিখেছিলেন আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য। ডিসি সারওয়ার আলম শাহজালাল মাজারের হিসাব প্রকাশ করে আবার আমাদের চোখ খুলে দিলেন। প্রশ্ন হলো, আমরা চোখ খোলা রাখব, নাকি আবার ঘুমিয়ে পড়ব?
আল্লাহ নেতাদের সুমতি দিন। সর্বপ্রকার জুলুমবাজির বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার হিম্মত দিন। মাজার হোক ভক্তির স্থান, ব্যবসার নয়। দানের টাকা যাক গরিব-দুঃখীর কল্যাণে, খাদেমের পকেটে নয়।
মনে রাখতে হবে, মাস্টার বলেছিল, “আমি মরলে আরেক মাস্টার জন্ম নেবে।” তেমনি একজন সারওয়ার সরলে, আরেক সারওয়ার যেন জন্ম নেয়। যতদিন ‘লালসালু’ থাকবে, ততদিন প্রতিবাদও থাকতে হবে।
সারওয়ার আলম দেখিয়ে দিলেন, ৭০০ বছরের প্রথাও ভাঙা যায়। এখন দরকার সাহস। দরকার জনগণের পাহারা। যাতে খাদেমচক্র আর কখনও মাজারের টাকা লুট করতে না পারে। যাতে ধর্মের নামে আর কোনো মজিদ গজিয়ে উঠতে না পারে।







