, ,

শুধু শাহপুর – দৌলতপুর সড়ক নয় দেশের অনেক সড়কের বেহাল অবস্থা

নিউজটি শেয়ার করুন

১. ভূমিকা : একটি সড়ক, কোটি মানুষের কান্না “আর কত দুর্ভোগ পোহাতে হবে? ধরিয়ে আর কান্না না। দেশ কি এমনিই স্বাধীন হয়েছে? কেন ঠিক হবে এই রাস্তা? ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব মিশিয়ে কথাগুলো বলছিলেন শাহপুর থেকে দৌলতপুরগামী মাহফুজা খাতুন।” দৈনিক পূর্বাঞ্চলের এই লাইনটি শুধু খুলনার একটি উপজেলার গল্প না। এটি ২০২৬ সালের বাংলাদেশের হাজারো সড়কের গল্প। শাহপুর-দৌলতপুর সড়ক আজ “অসহনীয় দুর্ভোগের প্রতীক”। পিচ উঠে গেছে, খানাখন্দে ভরা, বর্ষায় কাদা আর শুকনায় ধুলার ঝড়। অথচ এই সড়কটিই খুলনা, সাতক্ষীরা ও যশোর জেলার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। একটি সড়ক যখন মৃত্যুফাঁদ হয়, তখন বুঝতে হবে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর। শাহপুর-দৌলতপুর দিয়ে শুরু করে আজ আমরা দেখব দেশের সড়কের সামগ্রিক চিত্র।

২. শাহপুর-দৌলতপুর : ১ কিলোমিটারের দুঃস্বপ্ন ,দৈনিক পূর্বাঞ্চলের রিপোর্ট বলছে, খুলনার দৌলতপুর-ফুলবাড়ী-শাহপুর সড়কটি ১৯৮০-এর দশকে পাকরণ করা হয়। এরপর কয়েক দফা সংস্কার হলেও বর্তমানে শন্যুয়া থেকে শোলাগাতিয়া পর্যন্ত অংশ সবচেয়ে বেহাল।

সড়কের বর্তমান অবস্থা:
1. পিচ খোয়া উঠে গর্ত সৃষ্টি: সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে গভীর গর্ত হয়েছে। বৃষ্টি হলেই সেই গর্ত পানিতে ভরে যায়। মোটরসাইকেল, মাহেন্দ্র, ইজিবাইক ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়মিত উল্টে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
2. ধুলার ঝড় ও কাদার রাজ্য: শুকনো মৌসুমে ধুলা, বর্ষায় কাদা। “যানবাহন চলাচল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, তেমনি বাড়ছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।”
3. জীবনের উপর প্রভাব: এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত। রোগী হাসপাতালে যেতে পারে না সময়মতো। শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে দেরি করে। মালবাহী ট্রাক আটকে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি মিললেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

৩. ২ কোটি ২ লাখ টাকার প্রকল্প কোথায়?

সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, গত অর্থবছরে প্রায় ২ কোটি ২ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েও কাজ হয়নি। “কাজের দায়িত্ব পায় অনিক এন্টারপ্রাইজ। তবে কাজের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও এখনও পুরো কাজ সমাপ্ত হয়নি।”

এটাই বাংলাদেশের সড়ক সংস্কারের বাস্তবতা। বরাদ্দ আসে, টেন্ডার হয়, কিন্তু কাজ শেষ হয় না। ফলে “আমরা অমর্যাদা নির্বাহকারীদের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে” বলে অভিযোগ খুলনা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ড. রবিউল মন্ডল বলেন, “খুলনা থেকে শোলাগাতিয়া পর্যন্ত অংশে এত খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে যে পিচ ও খোয়া উঠে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্ক নিয়ে মানুষজন যাতায়াত করছে।”

৪. শুধু শাহপুর না : দেশজুড়ে একই চিত্র

শাহপুর-দৌলতপুর বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। দেশের অন্যান্য রিপোর্ট ঘাটলে দেখা যায় একই চিত্র।

ক. ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক: দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। কিন্তু কুমিল্লা-ফেনী অংশে প্রতি ৫০ মিটারে গর্ত। পণ্যবাহী ট্রাক উল্টে প্রতিদিন ২-৩ জন নিহত।

খ. ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক: গাজীপুর অংশে ৪ লেনের কাজ ৮ বছর ধরে চলছে। ধুলা আর যানজটে নাভিশ্বাস জনজীবন।

গ. উত্তরবঙ্গের সড়ক: রংপুর-দিনাজপুর, বগুড়া-নওগাঁ সড়ক বর্ষায় নদী হয়ে যায়। কৃষক তার ধান বাজারে নিতে পারে না।

ঘ. গ্রামীণ সড়ক: LGED এর আওতায় ৯০% গ্রামীণ সড়ক ৫ বছরের মধ্যে আবার ভেঙে যায়। কারণ নিম্নমানের কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর SROAD এর তথ্য বলছে, দেশে ২১,৪৮০ কিমি জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ৪০% “খারাপ” থেকে “খুব খারাপ” অবস্থায় আছে।

৫. কেন এই বেহাল দশা? ৫টি মূল কারণ

১. নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতি: “অনিক এন্টারপ্রাইজ” এর মতো ঠিকাদাররা কাজ অসমাপ্ত রেখে টাকা তুলে নেয়। সাব-বেইসে বালি বেশি, পিচ কম। ফলে ১ বছরেই পিচ উঠে যায়।

২. রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: নতুন সড়ক বানানো হয়, কিন্তু ৫ বছর পর মেরামত হয় না। SROAD এর বাজেটের মাত্র ১৫% যায় রক্ষণাবেক্ষণে।

৩. অতিরিক্ত লোড: নিয়মের চেয়ে ৩ গুণ বেশি ওজনের ট্রাক চলে। এতে সড়ক ৩ বছরের জায়গায় ১ বছরেই নষ্ট হয়।

৪. সমন্বয়হীনতা: সড়ক বিভাগ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস কোম্পানি একই সড়ক ৫ বার কাটে। কাটার পর আর আগের মতো জোড়া লাগে না।

৫. জবাবদিহিতার অভাব: প্রকল্প শেষ না হলেও কেউ শাস্তি পায় না। জনগণের ভোগান্তি নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।

৬. দুর্ভোগের মানবিক দিক

একটি খারাপ সড়ক শুধু গাড়ি নষ্ট করে না, এটি জীবন নষ্ট করে।

ক. স্বাস্থ্য: শাহপুরের রোগীকে হাসপাতালে নিতে ১ ঘন্টার রাস্তা ৩ ঘন্টা লাগে। অ্যাম্বুলেন্স গর্তে আটকে যায়। প্রসূতি মা রাস্তায় সন্তান প্রসব করে।

খ. শিক্ষা: দৌলতপুরের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে যেতে পারে না। শিক্ষকরা ক্লাসে দেরি করে আসে।

গ. অর্থনীতি: কৃষকের সবজি পচে যায়। ব্যবসায়ীর পরিবহন খরচ ৪০% বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারী আসতে চায় না।

ঘ. মৃত্যু: ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৬,৬৫৭ জন। এর মধ্যে ৬০% দুর্ঘটনার কারণ খারাপ সড়ক ও গর্ত।

৭. সরকার ও জনগণের করণীয়

সরকারের করণীয়:
1. গুণগত কাজ নিশ্চিত: ঠিকাদারদের ব্ল্যাকলিস্ট করা। কাজের গ্যারান্টি ৫ বছর করা।
2. ডিজিটাল মনিটরিং: প্রতিটি প্রকল্পের লাইভ ক্যামেরা ও অ্যাপ। জনগণ অভিযোগ করতে পারবে।
3. রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল: প্রতি বছর বাজেটের ৩০% রাখা সড়ক মেরামতের জন্য।
4. ওভারলোড বন্ধ: ওজন স্কেল বসানো। নিয়ম না মানলে গাড়ি ও মালিকের জেল।

জনগণের করণীয়:
1. সচেতনতা: গর্ত দেখলে ৯৯৯ বা SROAD অ্যাপে ছবি পাঠানো।
2. সামাজিক আন্দোলন: শাহপুরের মতো স্থানীয়রা মানববন্ধন, স্মারকলিপি দেওয়া।
3. দুর্নীতির প্রতিবাদ: টেন্ডার ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

৮. উপসংহার : সড়কই উন্নয়নের মেরুদণ্ড

একটি দেশের উন্নয়ন মাপা হয় তার সড়ক দিয়ে। জাপান, জার্মানির সড়ক দেখুন। আর আমাদের শাহপুর-দৌলতপুর দেখুন।

“যতদিন টেকসই ও প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে অন্তত জরুরি ভিত্তিতে গর্তগুলো ভরাট করে সড়কটি যানবাহনের উপযোগী করা না হয়, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।” — দৈনিক পূর্বাঞ্চলের এই সতর্কবাণী শুধু খুলনার জন্য না, গোটা দেশের জন্য।

২০২৬ সাল। আমরা স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলি। কিন্তু স্মার্ট হতে হলে আগে রাস্তা স্মার্ট করতে হবে। কারণ একটি ভালো সড়ক মানে একটি শিশুর স্কুলে যাওয়া, একটি রোগীর বাঁচা, একটি কৃষকের ফসল বিক্রি।

শাহপুর-দৌলতপুর সড়ক আমাদের লজ্জা দেয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের নামে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি।

আসুন, আমরা সবাই মিলে দাবি তুলি — “রাস্তা চাই, প্রতিশ্রুতি না”।

কারণ সড়ক ঠিক না থাকলে, দেশও ঠিক থাকবে না।

তথ্যসূত্র:
1. দৈনিক পূর্বাঞ্চল, “অসহনীয় দুর্ভোগের প্রতীক দৌলতপুর-শাহপুর সড়ক”, ২০ জুলাই ২০২৫
2. SROAD, Annual Report 2025
3. BRTA, সড়ক দুর্ঘটনা পরিসংখ্যান 2025
4. LGED, গ্রামীণ সড়ক অবস্থা রিপোর্ট 2025