, ,

মাজারের টাকা জনগণের: ব্যয় হোক জনকল্যাণে

নিউজটি শেয়ার করুন

“মুখ চেপে ধরলেই কি কণ্ঠ রোধ হবে?” — এই প্রশ্নটা এখন সিলেটের বাতাসে ঘুরছে। ডিসি সারওয়ার আলম যখন শাহজালাল মাজারের দানবাক্স খুলে দিলেন, তখন শুধু টাকা বের হয়নি, বের হয়েছে ৭০০ বছরের জমে থাকা অন্ধকার। অধ্যাপক তাশরিক-ই-হাবিব যখন ফেসবুকে গান গাইলেন, তখন শুধু সুর বের হয়নি, বের হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষণশীলতার মুখোশ। এবার প্রবাসী সাংবাদিক জুয়েল সাদাত বোমা ফাটালেন। ভিডিও সাক্ষাৎকারে ২৪ বছর মাজার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রবীণ লোকমান কোরেশীর জবানবন্দি তুলে ধরলেন। তাতে শাহজালাল দরগার ‘পোস্টমর্টেম’ হয়ে গেছে

 ১. শাহজালাল মাজার: ৩০০ পরিবারের ‘ওয়াকফ-রাজ্য’

লোকমান কোরেশী, বয়স ৮৫, দীর্ঘ ২৪ বছর দরগার ম্যানেজার ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শাহজালাল মাজারের টাকা-পয়সা কোনো ‘অজানা খাদেম’ খায় না, খায় সুনির্দিষ্ট ৩০০টি পরিবার। ১৯৮১ সালে এই পরিবারের সংখ্যা ছিল ১৮১, এখন বেড়ে ৩০০। কোনো ঝগড়া নেই, বিভক্তি নেই, একটা ‘সিস্টেমেটিক ওয়ে’তে ভাগ-বাটোয়ারা চলে।

দুই পরিবারের নিয়ন্ত্রণ: মূল নিয়ন্ত্রণ ‘সরকেওম’ ও ‘মুফতি’ পরিবারের হাতে। মূল মুতাওয়াল্লী সরকেওম জঙ্গী। সামুন মাহমুদকে ‘মুতাওয়াল্লী’ বলা হলেও লোকমান কোরেশীর দাবি, “উনি কেরানি। সবাই মুতাওয়াল্লী বলে চালাচ্ছেন।” শামুন ও জিন্নুন মৌলভীবাজারের বাসিন্দা।

আয়ের হিসাব: লোকমান কোরেশী যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখন দৈনিক আয় ছিল ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ। ১৮-২০ বছর পর এখন সাধারণ দিনে ৩-৪ লাখ, শুক্রবার বা বিশেষ দিনে ৫-৭ লাখ টাকা ওঠে। ডিসি সারওয়ারের গণনায় উঠে এসেছে দৈনিক ২০-২৫ লাখ টাকার হিসাব। অর্থাৎ আয় বেড়েছে ২০ গুণ, ভাগিদার বেড়েছে ১২০ পরিবার।

কী যায় এই ৩০০ পরিবারে? নগদ টাকা, সোনা-দানা, গরু, ছাগল, মুরগি— সব। এমনকি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৫ বছরের এমপির পুরো বেতন দান করেছিলেন, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ছেলে সন্তানের জন্য গরু দান করেছিলেন— সেই টাকাও নয়ছয় হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। শুধু মসজিদের দানবাক্সের টাকা মসজিদে যায়। বাকি সব ৩০০ পরিবারের পেটে।

এই পরিবারগুলোর সদস্যরা কোনো কাজ-ব্যবসা করেন না। যুগ যুগ ধরে অন্যের দানের টাকায় চলেন। আবার দরগার আশপাশে ওয়াকফ জায়গায় ফোর-স্টার আবাসিক হোটেল বানিয়ে ‘মিলিওনিয়ার’ হয়েছেন। দানবাক্সের টাকা + হোটেল ব্যবসা = দুইদিকেই লাভ।

### ২. ‘লালসালু ২.০’: সিলেটের অন্যান্য মাজারের চিত্র

শাহজালাল মাজার একা নয়। সিলেটে শাহপরান রহ., শাহ গাজী বুরহান উদ্দিন রহ., শাহ কামাল রহ., শাহ তাজউদ্দিন রহ.-সহ অন্তত ৩৬০ আউলিয়ার মাজার আছে। প্রায় সবগুলোর চিত্র একই।

হযরত শাহপরান রহ. মাজার: খাদিমদারি এখানেও বংশানুক্রমিক। দৈনিক আয় লাখ টাকার উপরে। ওরসের সময় কোটি টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাজারের উন্নয়ন, এতিমখানা, লঙ্গরখানায় ব্যয় হয় ১০-১৫%, বাকিটা খাদেম পরিবারগুলোর মধ্যে ভাগ হয়।

শাহ গাজী বুরহান উদ্দিন রহ. মাজার, বালাগঞ্জ: এখানে ‘গদ্দিনশীন’ পরিবার আছে। তারা জমি, দোকানপাট লিজ দিয়ে আয় করে। মান্নতের গরু-ছাগল প্রকাশ্য নিলাম হয় না, গোপনে ভাগ হয়।

সৈয়দ শাহ নুর রহ. মাজার, তালতলা: দরগার পাশে বিশাল মার্কেট। দোকান ভাড়া মাসে কয়েক লাখ। এই টাকার হিসাব ওয়াকফ প্রশাসনে যায় না বলে অভিযোগ।

প্যাটার্ন একটাই: ১. বংশানুক্রমিক খাদেম/মুতাওয়াল্লী। ২. আয়ের অস্বচ্ছ হিসাব। ৩. জনকল্যাণে ব্যয় ১০-২০%, বাকিটা ব্যক্তিগত। ৪. ওয়াকফ সম্পত্তিকে নিজের জমিদারি বানানো। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মজিদ একাই ঢিবি দখল করেছিল। এখন ৩০০ পরিবার মিলে পুরো দরগা দখল করেছে। এটাই ‘লালসালু ২.০’।

### ৩. টাকাটা কি হালাল? শরিয়ত ও আইন কী বলে?

লোকমান কোরেশীর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, দরগার আগের ইমাম আকবর আলী সবসময় বলতেন, “দরগার মাদ্রাসায় দান করুন এবং রিসিট নিন।” কারণ তিনি জানতেন, সরাসরি দানবাক্সে দিলে তা খাদেমদের পেটে যাবে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ: শাহজালাল রহ. ছিলেন ‘মুজাররদ’— সংসারবিরাগী। তিনি নিজে লঙ্গরখানা চালিয়ে গরিবকে খাওয়াতেন। তাঁর নামে মান্নত করে সেই টাকা যদি ৩০০ পরিবার বসে খায়, যারা কোনো উৎপাদনশীল কাজ করে না, তাহলে সেটা ‘সুহত’ বা হারাম আয়ের শামিল। কুরআনে বলা আছে, “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অন্যের সম্পদ ভক্ষণ করো না” [সূরা বাকারা: ১৮৮]।

আইনি দৃষ্টিকোণ: ১৯০৮ সালের ওয়াকফ আইন ও ১৯৬২ সালের ওয়াকফ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, মাজার একটি ওয়াকফ এস্টেট। এর মুতাওয়াল্লী জেলা প্রশাসক। আয়ের টাকা ওয়াকফের উদ্দেশ্য— মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, জনকল্যাণে ব্যয় বাধ্যতামূলক। ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়। ডিসি সারওয়ার আলম সেই আইনই প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন।

### ৪. কেন এখন বিস্ফোরণ? রাজনীতি ও টুরিজমের সমীকরণ

লোকমান কোরেশী জানাচ্ছেন, এই ভাগ-বাটোয়ারা নতুন না। এম সাইফুর রহমান একবার চেষ্টা করে থেমে যান। প্রশ্ন হলো, এখন কেন বিতর্ক?

এক. হোটেল ব্যবসা: সরকেওম-মুফতি গোষ্ঠী ওয়াকফ জায়গায় ফোর-স্টার হোটেল বানিয়েছে। “বিনা পয়সায় পরিবার চলে, পাশাপাশি ফোর-স্টার হোটেল” — এই বৈষম্য এখন সবার চোখে লাগছে।

দুই. রাজনৈতিক মেরুকরণ: জুয়েল সাদাতের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, জামায়াতের নীরব সমর্থন আছে স্বচ্ছতার পক্ষে, কারণ “দরগার ওয়ার্ডটা জামায়াতের” এবং তারা “দরগার চরমবিরোধী”। বিএনপি দুই ভাগ— এক অংশ ডিসিকে সাপোর্ট দিচ্ছে। সিলেটের দুই মন্ত্রীর অবস্থান অস্পষ্ট। অর্থাৎ মাজার এখন আর ধর্মীয় ইস্যু নয়, রাজনৈতিক ইস্যু।

তিন. টুরিজমের ভয়: সিলেটে কয়েক হাজার কোটি টাকার টুরিজম বিজনেস। মানুষ আসে শাহজালাল মাজারে। যদি প্রচার হয় যে, “আপনার দানের টাকা ৩০০ পরিবার খায়”, তাহলে ভক্তি কমবে। ভক্ত কমলে টুরিজম কমবে। তাই একপক্ষ চায় স্ট্যাটাস-কো বজায় থাক, আরেকপক্ষ চায় সংস্কার।

### ৫. শাহজালাল রহ. বিবাহিত ছিলেন? ইতিহাসের পুনর্পাঠ

জুয়েল সাদাতের রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরিষদের সভাপতি দত্ত চৌধুরী: “শাহজালাল রহ. বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর ২টা মেয়ে ছিল।” অথচ শত শত বছর ধরে আমরা জেনে এসেছি তিনি ‘মুজাররদ’— চিরকুমার।

যদি তিনি বিবাহিতও হন, তাতে তাঁর মর্যাদা কমে না। বরং প্রশ্ন ওঠে, তাঁর বংশধররা কোথায়? আজ যে ৩০০ পরিবার ‘খাদেম’ দাবি করছে, তারা কি তাঁর বংশধর? ইতিহাস তা বলে না। তাহলে এই ‘খাদেম’ পদবীটাই কীভাবে বংশানুক্রমিক হলো? এটা গবেষণার বিষয়। কিন্তু নিশ্চিত, শাহজালাল রহ. সন্তানদের জন্য সম্পদের পাহাড় রেখে যাননি। তিনি রেখে গেছেন ত্যাগের শিক্ষা।

### ৬. সমাধান কোথায়? মুখ চেপে নয়, হিসাব খুলে দিতে হবে

১. স্বচ্ছ অডিট: শাহজালাল, শাহপরানসহ সিলেটের সব মাজারের আয়-ব্যয় প্রতি মাসে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। ডিসি সারওয়ারের মতো প্রকাশ্যে গণনা চালু করতে হবে।
২. যৌথ ব্যবস্থাপনা: মুতাওয়াল্লী হিসেবে ডিসি থাকবেন, সাথে খাদেম পরিবার, সুশীল সমাজ, আলেম, হিসাব বিশেষজ্ঞ নিয়ে কমিটি হবে। একক পরিবারের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে হবে।
৩. আইনের প্রয়োগ: ওয়াকফ আইন অনুযায়ী ৮০% টাকা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় বাধ্যতামূলক করতে হবে। ২০% প্রশাসনিক।
৪. খাদেমদের পুনর্বাসন: যারা শত বছর ধরে সেবা দিচ্ছেন, তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী করা হোক। কিন্তু ‘মালিক’ নয়। বংশানুক্রমিক ভোগদখল বন্ধ করতে হবে।

### শেষ কথা: মাজারের টাকা জনগণের

ইরানে পারাস্তু আহমাদিকে দোররা মেরে গান থামানো যায়নি। ঢাবিতে তাশরিককে অব্যাহতি দিয়ে সুর থামানো যায়নি। সিলেটে সারওয়ারকে সরিয়ে দিয়ে হিসাব থামানো যাবে না। কারণ জনগণ এখন জানে, শাহজালাল মাজারে প্রতিদিন ২০-২৫ লাখ টাকা ওঠে। জানে, ৩০০ পরিবার সেটা ভাগ করে খায়। জানে, ফোর-স্টার হোটেল কার টাকায় হয়।

হযরত শাহজালাল রহ. তলোয়ার হাতে গৌরগোবিন্দের জুলুম ভেঙেছিলেন। আজ তাঁর নামে গড়ে ওঠা জুলুম ভাঙতে হবে কলম আর হিসাবের খাতা হাতে। তিনি বিবাহিত হোন বা মুজাররদ, তাঁর শিক্ষা ছিল— “লোভ ছাড়ো, মানুষের সেবা করো”।

তাই আজকের দাবি একটাই: শাহজালাল রহ. সহ সিলেটের সকল মাজারের টাকা জনগণের। এটা কোনো ৩০০ পরিবারের জমিদারি না। এটা গরিবের, এতিমের, রোগীর, ছাত্রের। মুখ চেপে ধরে এই সত্য রোধ করা যাবে না। কারণ কণ্ঠ এখন আর একা ডিসি সারওয়ার বা অধ্যাপক তাশরিকের না। কণ্ঠ এখন সিলেটের লাখ লাখ মানুষের, প্রবাসের কোটি মানুষের।

আর জনতার কণ্ঠকে চেপে ধরলে তা বিস্ফোরণ হয়েই বের হয়। জুয়েল সাদাতের ক্যামেরা সেই বিস্ফোরণের শব্দই ধারণ করেছে।