শহরের ধুলোবালি আর কোলাহলের মাঝে জাহিদ আনসারী এক আজন্ম অভিযাত্রী। তার কলমে কেবল কালির ছোপ লাগে না, লাগে মানুষের ঘাম আর চোখের নোনা জল। প্রতিদিনের রুটিন মাফিক গলি দিয়ে মূল রাস্তায় বেরিয়ে আসার সময় এক কাপ চায়ের অভ্যাসে সেদিন এক অদ্ভুত বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছিল সে।
রাস্তার ধারের টং দোকানের সেই পরিচিত কোণে সেদিন এক যুবকের দেখা মিলল। বয়স তিরিশের কোঠায়, কিন্তু চেহারায় অকাল বার্ধক্যের ছাপ। চুলগুলো জট পাকানো, দাড়ি উস্কোখুস্কো, আর চোখের কোণে জমে থাকা বিষণ্ণতা বলে দিচ্ছিল সে কোনো এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। চা খাওয়ার ফাঁকে জাহিদের সাংবাদিক মনটা অবচেতনভাবেই সক্রিয় হয়ে উঠল। পকেট থেকে মোবাইলটি বের করে খুব সন্তর্পণে যুবকের অগোছালো জীবনের এক একটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করল সে। ঠিক সেই সময়, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা লোক সিগারেট টানতে টানতে বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দেখছেন তো ছেলেটাকে? একসময় ওকে দত্তক নিয়েছিল ওর বাবা-মা। সন্তানহীন দম্পতির সব আলো ছিল ও। আর আজ? আজ ওরা ওকে পাগল বানিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে, যেন ওর কোনো অস্তিত্বই নেই!”
জাহিদের মনে হলো কোনো এক অদৃশ্য তূণ থেকে তীরের মতো বিঁধল কথাগুলো। দত্তক নেওয়া সন্তান, বাবা-মায়ের নিষ্ঠুরতা—সব মিলিয়ে এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু নিজের ব্যস্ততার জালে আটকা পড়া জাহিদ তৎক্ষণাৎ ছেলেটির সাথে কথা বলতে পারল না। ফেরার পথে যখন সিদ্ধান্ত নিল ছেলেটির পরিচয় জানবে, ততক্ষণে সে মরীচিকার মতো মিলিয়ে গেছে।
কয়েক দিন ধরে জাহিদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেই যুবকের মুখ। সে আবার রাস্তায় নামল। কিন্তু শহর যেন নিজের পেটে গিলে ফেলেছে সেই নিরুদ্দেশ যুবককে। অবশেষে সে শরণাপন্ন হলো হেকমত আলীর। অবসরপ্রাপ্ত এই আবহাওয়াবিদ জীবনের হিসাব-নিকাশে অভিজ্ঞ। জাহিদ তার পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করল। গ্যালারি থেকে ওইদিন টং দোকানের কোণে তোলা সেই যুবকের অস্পষ্ট ছবিগুলো একে একে হেকমত আলীর সামনে ধরল জাহিদ।
ছবিগুলো দেখে হেকমত আলী চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে স্থির চোখে জাহিদের দিকে তাকালেন। তারপর এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললেন, “জাহিদ, মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখতে শেখো। তুমি যে করুণার গল্প বলছ, তা হয়তো একপাক্ষিক। এই ছবির ছেলেটির পেছনের ইতিহাসটা আমি জানি। ও নেশার টাকা জোগাতে সমাজের সহানুভূতিকে পুঁজি করে। ওর বাবা-মা এখনো বেঁচে আছেন, যারা তাদের এই বেপরোয়া সন্তানের পেছনে সর্বস্ব খুইয়ে আজ পথে বসার উপক্রম।”
জাহিদের মাথার ওপরের আকাশটা যেন আচমকা ভেঙে পড়ল। যে করুণাকে সে মহৎ মনে করেছিল, তা কি তবে এক নিপুণ ছলচাতুরি?
হেকমত আলী এবং জাহিদ সেদিন বিকেলে চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে গলির মোড় দিয়ে হাঁটছিলেন। জাহিদের হাতে তখনো সেই মোবাইল, স্ক্রিনে ছেলেটির ছবি। হঠাৎ হেকমত আলী জাহিদের হাত চেপে ধরে ইশারায় দেখালেন। গলির মুখ দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে এক যুবক। এবার তার পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। জাহিদ স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল—এ সেই ছেলেটিই, কিন্তু আজ তার চেহারায় নেই সেই অকাল বার্ধক্যের ছাপ! হেকমত আলী জাহিদের মোবাইলের ছবির দিকে একবার তাকিয়ে ছেলেটির দিকে ইঙ্গিত করে ফিসফিস করে বললেন, “দেখছেন তো জাহিদ? ওই যে, এই সেই ছেলে। পোশাক আর পরিস্থিতি বদলালেই মানুষ কীভাবে নিজের সত্যকে লুকুতে পারে, দেখছেন?”
জাহিদ বুঝল, সত্য কখনো স্থির নয়; তা সময়ের স্রোতে পাল্টায়, মানুষের দেখার ভঙ্গি অনুযায়ী তার রূপ বদলায়। সে আজ কোনো চটকদার শিরোনাম লিখল না, নোটবুকে কেবল লিখে রাখল এক গভীর উপলব্ধির কথা—যেখানে মানুষ আজও নিজের ছায়াকেই ভয় পায়, আর সত্যকে খুঁজে বেড়ায় মিথ্যার গোলকধাঁধায়।







