, ,

ভাষা আন্দোলনে সিলেট ড.তৌফিক রহমান চৌধুরী

নিউজটি শেয়ার করুন

[21/02, 2:05 pm] Press. Ashouk Da. সম্পাদক স্বদেশ বিচিত্র: ভাষা আন্দোলনে সিলেট
ড.তৌফিক রহমান চৌধুরী

“আমাদের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন বহুমাত্রিক আবেদনে অনন্য। জাতির চলার পথে চেতনার অনন্ত উৎস ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ অধ্যায়ে সিলেটবাসীর উজ্জ্বল অংশগ্রহণ এখানকার স্বতন্ত্র প্রাণশক্তির পরিচায়ক।”

“ভাষা আন্দোলনের প্রবল ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল সিলেটের মাটিতেও। আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেট বরাবরই ছিল স্বতন্ত্র, কিছুটা ভিন্ন। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট সফরের সময় রবীন্দ্র সংবর্ধনার অন্যতম প্রধান আমন্ত্রক বক্তৃতা দিয়েছিলেন উর্দুতে। কারণ তৎকালীন সিলেটে প্রবল রক্ষণশীল পরিবেশ ছিল। কিন্তু দিনে দিনে তা অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় সিলেটের সাধারণ মানুষ।

মাতৃভাষার প্রশ্নে ও দাবিতে সিলেটবাসীকে খুঁজে পাওয়া যায় আন্দোলনের প্রথম সারিতেই। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তমদ্দুন মজলিস ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে। ১৯৪৭ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক সিলেটে চলতি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নানা সভা, সমাবেশ, সেমিনারে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কটি উঠে এসেছিল।”

“ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়নি। এর অনেক পরে ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারি বা মার্চে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ওঠে।সিলেটের সচেতন কবি-লেখক-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজের কাছ থেকে ওঠা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি জনগণের দাবিতে পরিণত হয়।”

“সিলেটের ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকা। নওবেলাল পত্রিকা সিলেট থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে। নওবেলাল পত্রিকার প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক মাহমুদ আলী ছিলেন রাজনীতিবিদ। রাজনীতি চর্চার জন্যই তিনি সিলেট থেকে নওবেলাল পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেছিলেন। নওবেলালের সম্পাদক ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ।এ পত্রিকায় যেমন কেন্দ্রীয় আন্দোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক তেমনি আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে সিলেটের ভাষা আন্দোলনের নানা খবরাখবর প্রকাশিত হতো।

১৯৪৭ সালের শেষ দিক থেকেই সিলেট শহরে এবং শিক্ষিত মহলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে সিলেটের শিক্ষিত শ্রেণিতে জনমত গঠনের জন্য আলোচনার সূত্রপাত করেছিল সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সমাজ।মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ছিল আল ইসলাহ। আল ইসলাহর ১৯৪৭ সালের আগস্ট সংখ্যায় এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, ‘বাংলার পরিবর্তে অন্য কোনো ভাষা আমাদের রাষ্ট্রভাষা হউক ইহা আমরা কখনো সমর্থন করিতে পারি না।’ভাষাসংগ্রামী’ আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘স্মৃতি অম্লান ১৯৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, সিলেটে শুরু থেকেই আমরা ভাষা নিয়ে বিশেষ তৎপর ছিলাম। এর কারণ বোধ হয় ছিল কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের দশোর্ধ্ব বছরের সাধনা।’

সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে সে বছরের ৯, ৩০ নভেম্বর এবং ২৮ ডিসেম্বর সিলেটে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট ১৯৪৭-এর ৯ নভেম্বর নিজস্ব হল রুমে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে একটি আসর ডাকে। যেখানে শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মুসলিম চৌধুরী ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক একটি মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন।৩০ নভেম্বর সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী এবং ২৮ ডিসেম্বর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। ৩০ নভেম্বর সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা হলে ভাষা বিষয়ক সেই আলোচনা সভায় সৈয়দ মুজতবা আলী এক দীর্ঘ বক্তৃতা উপস্থাপন করেছিলেন। সে বক্তব্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী।

বক্তব্যে মুজতবা আলী বলেছিলেন, বাংলায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হবে চরম বোকামি। তার সেই বক্তব্যটি ১৯৪৯ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এ বক্তব্যের জন্য পরে মুজতবা আলীকে প্রচুর হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল।

সিলেটের ভাষা আন্দোলনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধী ছিলেন অনেকেই। বিরোধীদের মধ্যে ছিলেন আজমল আলী চৌধুরী, তৈমুর রাজা দেওয়ান, আবদুল মজিদ, মাওলানা জামিরুল হক, মঈনুদ্দিন আহমদ চৌধুরী।

“ক্রমে ক্রমে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের নিরিবিলি আওতা হতে তৎকালীন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দচরণ পার্কে (বর্তমান হাসান মার্কেট) সিলেটে ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সূচনা হয়। ওখানেই বাংলা ভাষার পক্ষে সভা-সমাবেশ হতো।রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেটের গোবিন্দ চরণ পার্কের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। বন্দরবাজারের আজকের হাসান মার্কেটের নাম ছিল তখন গোবিন্দ পার্ক। সিলেটের সকল আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু এখন যেমন কোর্টপয়েন্ট, রেজিস্টারি মাঠ তেমনি সেকালে ছিল গোবিন্দ চরণ পার্ক।এই পার্কের জায়গায় ১৯৫৯ সালে গড়ে তোলা হয় বর্তমান হাসান মার্কেট। এটি বর্তমানে সিলেট সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন একটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের শপিংমল। এখানে গোবিন্দ চরণ পার্কের কোনো স্মৃতিচিহ্ন রাখা হয়নি। ফলে এই ঐতিহাসিক পার্কটি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেনই না।”

“১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারি পাকিস্তানের যোগাযোগমন্ত্রী সর্দার আবদুর রব নিশতার সিলেট সফরে এলে স্থানীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি ছাত্রনেতা আবদুস সামাদসহ সিলেটের ছাত্র সমাজের প্রতিনিধিরা তার কাছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসহ একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।
একই সময়ে সিলেটের নারী প্রতিনিধি দলও মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরলে তাও ব্যর্থ হয়। এছাড়া ১৯৪৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিলেটের এই বিশিষ্ট নারীরা মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে একাধিক দাবিতে স্মারকলিপি পাঠিয়েছিলেন। দাবিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতিদানের বিষয়টিও উল্লেখ ছিল। সেই স্মারকলিপিতে সই করেছিলেন যোবেদা খাতুন চৌধুরাণী, শাহেরা বানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেছা।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়ে গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে গণপরিষদের মুসলিম লীগের সদস্যদের প্রস্তাবের বিরোধিতা এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মতো গর্জে উঠেছিল সিলেটের ছাত্র সমাজও।
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অনুসরণে মার্চ মাসের শুরু থেকে ঢাকার মতো সিলেটেও নানা কর্মসূচি পালিত হতে শুরু করে।৮ মার্চ তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের উদ্যোগে সিলেটের গোবিন্দচরণ পার্কে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মাহমুদ আলী। শুরুর সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম লীগের উগ্রপন্থীরা সভা ভণ্ডুল করে দেয়। এ সময় তারা ছাত্রনেতা মকসুদ আহমদকে ব্যাপক মারধর করে। মুসলিম লীগের উগ্রপন্থীদের ইটপাটকেলে আহত হন নওবেলাল পত্রিকার সম্পাদক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, আব্দুস সামাদ, দেওয়ান ওহিদুর রেজাসহ বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা। ওই জনসভাস্থলে এম. এ. বারীর (ধলা) সভাপতিত্বে পাল্টা উর্দুর দাবিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এম. এ. বারী অবশ্য ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বাংলা ভাষার পক্ষে কাজ করেন।

মুসলিম লীগের এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে সিলেট জেলা মহিলা মুসলিম লীগ ১০ মার্চ গোবিন্দচরণ পার্কে জনসভা আহ্বান করে। কিন্তু সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উত্তেজনাময় পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে সমগ্র সিলেট জেলায় ২ মাসের জন্য রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক সব সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন।
যার ফলে ১১ মার্চ সিলেটে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়নি। তবে এদিন সিলেটের প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তমদ্দুন মজলিসের সিলেটের সম্পাদক দেওয়ান অহিদুর রেজা ও মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ নওবেলাল পত্রিকায় এক বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। এদিন সিলেটের ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিও প্রদান করেছিলেন।
সে বছর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ২১ এবং ২৪ মার্চ যথাক্রমে রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন সভায় ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা করলে উপস্থিত ছাত্ররা প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সিলেটেও এ সময় প্রতিবাদ করেন সাধারণ ছাত্ররা। তবে তা ছিল অনেকাংশেই স্বল্প এবং সংক্ষিপ্ত পরিসরে।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা দিলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সিলেটের ছাত্র-জনতাও। আন্দোলনকে সুসংহতভাবে পরিচালিত করার জন্য পীর হাবিবুর রহমানকে আহবায়ক করে সিলেটে ঘোষিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সিলেটের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে আরো ছিলেন মাহমুদ আলী, নুরুর রহমান, মনির উদ্দিন আহমদ, হাজেরা মাহমুদ, সৈয়দ মোতাহার আলী, আবদুর রহিম প্রমুখ। এরপর কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের মতো সিলেটেও পালিত হয় নানা কর্মসূচি।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশি গুলিবর্ষণে ছাত্রহত্যার খবর সেদিন রাতেই টেলিফোন মারফত সিলেটে পৌঁছে। মুহূর্তেই গর্জে উঠে সিলেট শহর। ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে মাহমুদ আলী, আব্দুর রহিম, এ জেড আবদুল্লা, মতছির আলী উল্লেখযোগ্য।
ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে সিলেট শহর তখন চরম উত্তাল। ছাত্র ধর্মঘটসহ শহরে পূর্ণ হরতাল চলছে। বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে সর্বস্তরের মানুষ। রাস্তায় তখন স্লোগান, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’, ‘খুনি নুরুল আমিনের বিচার চাই’ ‘মন্ত্রিসভার পদত্যাগ চাই’।
২২ ফেব্রুয়ারি সকালে সিলেটের রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ এক জরুরি সভায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সেদিন বিকেলে জনসভা ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এদিন সিলেটের মার্চেন্ট এসোসিয়েশন পূর্ণ ধর্মঘট পালন করে।
এদিন দুপুর ৩টায় নগরীর গোবিন্দচরণ পার্কে উকিল আব্দুল্লা বি.এলের সভাপতিত্বে এক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় যোগ দিয়েছিলেন সিলেটের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। সভায় ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটে পূর্ণ হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এদিন স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি দল মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি দেওয়ান তৈমুর রাজার সঙ্গে দেখা করে তাকে পদত্যাগের অনুরোধ জানান। রাত ৮টায় ছাত্র জনতার এক দীর্ঘ শোক শোভাযাত্রা সিলেট নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে।
২২ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ভাষা আন্দোলনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল ৬ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সিলেট, ২৯শে ফেব্রুয়ারী। ঢাকায় নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২২শে ফেব্রুয়ারী শুক্রবার বিকেল ৪ ঘটিকার সময়ে সিলেটের গোবিন্দ পার্কে এক বিরাট জনসভা হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় বার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারী জনাব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বি.এল। ঐদিন শহর এবং শহরতলীতে পূর্ণ হরতাল প্রতিপালিত হয়। অফিস আদালতও বন্ধ থাকে…।’
২৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় নগরীর গোবিন্দচরণ পার্কে অনুষ্ঠিত হয় নারীদের এক সভা। সভায় সভাপতিত্ব করেন নারীনেত্রী যোবেদা খাতুন। ছাত্রহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বক্তব্য দেন নারীনেত্রী বেগম হাজেরা মাহমুদ।
এদিন বিকেলে নগরীর গোবিন্দচরণ পার্কে আরেকটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে জিন্নাহ হলে অনুষ্ঠিত হয় নারীদের প্রতিবাদ সভা।
৫ মার্চ সিলেট নগরীর গোবিন্দ চরণ পার্কে অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সবশেষ সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ। বক্তব্য দেন নওবেলাল সম্পাদক মাহমুদ আলী, দবির উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, তেরা মিয়া, মোয়াজ্জম আহমদ চৌধুরী, আবদুল বারী, আবুল মাল আবদুল মুহিত, মতছির আলী।
ভাষা আন্দোলন হয় সমগ্র সিলেট অঞ্চলে। বিয়ানীবাজার, শায়েস্তাগঞ্জ, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ, বানিয়াচং, ফেঞ্চুগঞ্জ, বিশ্বনাথ থেকে সিলেটের সমস্ত মহকুমা, থানা, ইউনিয়ন, গ্রামে-গঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদেও ছড়িয়ে পড়েছিল ভাষা আন্দোলন। দ্বিতীয় পর্বের সিলেটের ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে নওবেলাল পত্রিকা। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ‘নওবেলালে’র প্রতিটি সংখ্যাতেই নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় ভাষা আন্দোলনের সংবাদ।আর এই ভাষা আন্দোলনের ফলেই আমরা আমাদের স্বতন্ত্র সত্তা সম্বন্ধে অবহিত হয়েছি এবং তারই পরিণতিতে আমরা আমাদের স্বাধীনতা লাভ করছি॥

…সংকোলিত।

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ

বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি।
আহমাদ ইশতিয়াক,দ্যা ডেইলি স্টার বাংলা।
আব্দুল হামিদ মানিক-‘সিলেটে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি’।
ভাষা আন্দোলন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া/ আহমদ রফিক।
দৈনিক আজাদ।

ড.তৌফিক রহমান চৌধুরী
লেখক,শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ
প্রতিষ্ঠাতা , মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি,সিলেট ।
[21/02, 3:53 pm] Press. Ashouk Da. সম্পাদক স্বদেশ বিচিত্র: প্রথম বাংলা ভাষার জন্য গণপরিষদ দাবি তুলছেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

পাকিস্তানের গণপরিষদ যেখানে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সামনে দীপ্ত কণ্ঠে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি উপস্থাপন করেছিলেন। সেই সময় পূর্ব বাংলার অনেক জনপ্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন, কেউ কিন্তু তা করতে সাহস পাননি, যা পেরেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের সঙ্গে তিনি সক্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উত্তরে রামরাইল গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন মুনসেফ কোর্টের সেরেস্তাদার। তিনি ১৯০৪ সালে নবীনগর হাই স্কুল হতে প্রবেশিকা, ১৯০৮ সালে কলকাতা রিপন কলেজ হতে বি.এ এবং ১৯১০ সালে একই কলেজ হতে বি.এল পরীক্ষা পাস করেন।১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের গণপরিষদের ব্যবহার্য ভাষা হবে উর্দু এবং ইংরেজি, তা প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এবং এই অধিবেশনের ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে উর্দু এবং ইংরেজিতে শুরু হলে তার প্রতিবাদ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় গণপরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, দেশের ৬ কোটি ৯০ লাখ নাগরিকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, তাহলে আপনিই বলুন মাননীয় সভাপতি রাষ্ট্র ভাষা কী হওয়া উচিত। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বানের নোটিস জারি হলে ২৩ ফেব্রুয়ারি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তার একটি সংশোধনী প্রস্তাব দাখিল করেন, তার মূল প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ২৯নং বিধির ১নং উপবিধিতে উর্দু এবং ইংরেজির পর বাংলা শব্দটি সংযুক্ত করার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে রক্ত ঝরে। ২২ ফেব্রুয়ারি এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের অধিবেশন বয়কট করেন এবং এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। পরে তিনি কুমিল্লায় চলে আসেন।
তখন থেকেই তার কুমিল্লায় স্থায়ী বাস। প্রথম দিকে কুমিল্লার আদালতের উত্তরে কাপ্তানবাজারে গোমতীর পাড়ে একটি বাসগৃহে ভাড়া থাকতেন। পরে ধর্মসাগর দীঘির পশ্চিমপাড়ে জমি কিনে একটি টিনের আটচালা বাড়ি গড়ে এই বাড়িতেই তিনি আমৃত্যু কাটিয়ে দেন। তাঁর নাতনি আরমা দত্ত সংবাদ মাধ্যমে জানান, ‘পেশা, রাজনীতি এবং আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরুকরে সবই ছিলো কুমিল্লা কেন্দ্রিক। আমৃত্যু তিনি কুমিল্লার ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড় তাঁর নিজহাতে গড়া এই বাড়িটিতে ছিলেন। ইতিহাসের মহানায়ক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আজ নেই। তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে আজ পতপত করে উড়ছে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের পতাকা। তাঁরই স্বপ্নের বাংলা ভাষা আজ শুধু রাষ্ট্র ভাষাই নয়; ভাষা আন্দোলনের সে দিনটি আজ আন্তর্জাতিক ভাবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছ। কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন এবং বাংলা ভাষা আন্দোলনের মহানায়কের যথাযথ মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাক হানাদাররা হত্যা করেছিলো, সেই ঐতিহাসিক বাড়িটির কি অবস্থা তার জন্য প্রশাসনকে অবশ্যই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রয়োজনে বাড়িটিকে ধীরেন্দ্রনাথ যাদুঘরে রূপান্তর করে নতুন প্রজন্মকে ভাষা সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হোক। বাংলা ভাষা আন্দোলনের এই মহানায়কের যথাযথ মূল্যায়ন খুবই প্রয়োজন।
🖋️রূপম চক্রবর্ত্তী – প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট – চট্টগ্রাম
#বাংলা #ভাষা #ভাষাআন্দোলন #কুমিল্লা #রাষ্ট্র