দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসছে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা-সব মিলিয়ে ঢাকাকে এখন নতুনভাবে দেখছে বিশ্বশক্তিগুলো। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ঢাকায় সফর করেন পল কাপুর, যিনি United States Department of State-এর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
কূটনৈতিক সফর অনেক সময়ই আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও সৌজন্য সাক্ষাতের সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু পল কাপুরের সফরকে ঘিরে আলোচনার মাত্রা ছিল ভিন্ন। কারণ, এই সফরের পেছনে ছিল এমন কিছু কৌশলগত প্রশ্ন, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা কাঠামো এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক বিকশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন বাজার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা-ভূরাজনীতি। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নিয়ে যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত উপস্থিতি শক্তিশালী করতে চাইছে। আর সেই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে বঙ্গোপসাগর।
এই প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটিজি এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো। এই কৌশলের লক্ষ্য হলো মুক্ত ও উন্মুক্ত সমুদ্রপথ নিশ্চিত করা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এই কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকতে পারে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।
পল কাপুরের সফরকে তাই অনেক বিশ্লেষক শুধুমাত্র একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখেন না। বরং এটি ছিল ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ভিসা নীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং সামরিক সহযোগিতা-সবই ছিল আলোচনার বিষয়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত Agreement on Reciprocal Trade বা আরটিএ চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি পরীক্ষাও বটে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিল্প ও বাজার কতটা প্রস্তুত,তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কিন্তু পল কাপুরের সফরের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, সেটি হলো সম্ভাব্য সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। বিশেষ করে দুটি চুক্তির প্রসঙ্গ আবারও আলোচনায় এসেছে- General Security of Military Information Agreement এবং Acquisition and Cross-Servicing Agreement।
GSOMIA মূলত একটি নিরাপত্তা কাঠামো, যার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সামরিক তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে ACSA চুক্তি সামরিক লজিস্টিক সহযোগিতার একটি কাঠামো প্রদান করে। এই চুক্তি হলে দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনী প্রয়োজনে একে অপরের কাছ থেকে জ্বালানি, সরঞ্জাম বা অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা নিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ধরনের চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে। এর পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য।
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে এমন একটি কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাঝেও নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি না করে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখা।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বরাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা এখন কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক নয়, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল, সমুদ্রপথ এবং নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতাও ঢাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় GSOMIA বা ACSA নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সেটি নিছক একটি সামরিক চুক্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয় হয়ে উঠবে।
পল কাপুরের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে, তার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
বঙ্গোপসাগর এখন কেবল একটি ভৌগোলিক জলরাশি নয়, এটি হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। এই অঞ্চলের সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য চলাচল করে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, সাবমেরিন কেবল এবং সামুদ্রিক সম্পদের বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে এই অঞ্চলে যে কোনো নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বা সামরিক সহযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করবে।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো-এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ঢাকার অবস্থান কী হবে?
বাংলাদেশ কি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্যের ওপর গুরুত্ব দেবে, নাকি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর কৌশলগত ভূমিকায় নিজেকে প্রস্তুত করবে?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ, কৌশলগত ভূমিকা যত বাড়বে, ততই বাড়বে দায়িত্ব এবং ঝুঁকিও।
পল কাপুরের সফর হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। কিন্তু এটি একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে-বাংলাদেশ এখন আর আঞ্চলিক রাজনীতির প্রান্তিক একটি রাষ্ট্র নয়। বরং এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বৈশ্বিক কৌশলগত আলোচনায়।
ঢাকার সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো,এই নতুন বাস্তবতার মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। শক্তিশালী অর্থনীতি, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা নীতি-এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া সেই পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
পল কাপুরের সফর হয়তো ছিল মাত্র দুদিনের। কিন্তু এই সফর যে প্রশ্নগুলো সামনে এনে দিয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
#
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক







